11/08/2017
১০ বছর হয়ে গেল চাকরি করছি| ২০০৬ থেকে শুরু করেছিলাম| যদিও বাবা retired করে গেছেন তবু ফ্যামিলি-র অবস্থা এখন অনেক সচ্ছল| আপাতত একটা ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স হয়েছে| বাড়ি থেকে বিয়ের জন্য তারা দিচ্ছে| তার কারণ আছে নয় নয় করে ৩২ তো হলো বয়সটা|
আসলে ইচ্ছা করে যে বিয়ে করতে চাইছি না তা নয়| একটা অন্য কিছু করার ইচ্ছা আছে| Creative কিছু| কলেজ-এ পড়তে একটু লেখালেখি করতাম, কিন্তু তা বেশি দূর এগোয়নি| এখন ইচ্ছা আছে একটু ভালো করে লেখা| সময় দিয়ে, মন দিয়ে| হৃদয়ে feel করতে চাই যে হ্যাঁ লিখছি| কিন্তু শুরু করতে পারছিলাম না| না পারছি চাকরি ছেড়ে লেখা ধরতে, না পারছি লেখা ছেড়ে বিয়ে করতে| চাকরি ছাড়বো এই কথাটাও যেন ভাবতেই ভয় লাগে|
যাই হোক, ও রকম করেই চলছিল| একদিন বড়দা খুব রাগারাগি করলো| বিয়ের ব্যাপার নিয়ে| বড়দার রাগটা যুক্তি সঙ্গত, কিন্তু আমার ego তে লাগলো, যে একটা প্রচেষ্টা আমি করবোই, লেখক হিসাবে প্রতিষ্টা পাওয়ার| আর তার জন্য আমি চাকরি ছাড়তে চাই, আবার চাকরি না থাকা অবস্থাতে কাউকে বিয়েও করতে চাই না|
সেদিন ছিল রবিবার, বড়দা খুব রাগারাগি কারাতে, আমি জামাকাপড় আর trolley-ব্যাগ টা গুছিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলাম| মা কে প্রণাম করে বলে গেলাম "লেখক হয়েই ফিরবো, আমার জন্য চিন্তা কোরোনা"| সোজা গিয়ে উঠলাম সুমিত-এর ফ্লাট-এ| ও আমার কলিগ| অবিবাহিত, তাই বেশ একটা বন্ধুত্ব আছে| ওকে বললাম "চাকরি ছেড়ে দিচ্ছি"| এই কথা শুনে ও আকাশ থেকে পড়লো| আমি বললাম "আমি একটা creative কিছু করতে চাইছি"| ও বললো "যাই হোক এটা practical ডিসিশন নয়"| আমি চুপ করে গেলাম|
পরের দিন অফিস পৌঁছে, ম্যানেজারের সাথে আমার চাকরি ছাড়ার ব্যাপারটা বললাম| অনেক বোঝাপড়ার পর ম্যানেজার ১ মাস বাদে ছাড়তে রাজি হলো| মন ফ্রেশ করে সুমিত-এর ফ্লাট-এ ফিরলাম| রাতে আমরা বাইরে খেলাম|
নেক্সট কয়েকদিন ধরে লেখা শুরু করা ব্যাপারটা আমার মনের মধ্যে ছেয়ে গেলো| আমার সমস্ত সত্ত্বায় যেন লেখক ব্যাপারটা feel করতে শুরু করলাম| মনে মনে ভাবলাম, কলকাতা তে থেকে চাকরি না করে আমি খরচ পোষাতে পারবো না| আর লেখার বেপারে একটু শান্ত নিরিবিলি জায়গা হলেই ভালো| এই নিয়ে সুমিত-এর সাথে discuss করছিলাম| সুমিত বললো ওর দাদুর বাড়ি মুর্শিদাবাদের নিমতিতা তে| নিমতিতা জায়গাটা শুনেই মনটা চমক দিয়ে উঠলো| সত্যজিৎ রায়-এর জলসাঘর সিনেমাটির শুটিং নিমতিতাতে হয়েছিল| সত্যজিৎ রায়-এর প্রতি আমার খুব শ্রদ্ধা ছিল, ওনার সুক্ষ, innovative, কাজ আমার মনে অনেকদিন থেকেই জায়গা করে নিয়েছিল| আর তাছাড়া নিমতিতা গঙ্গার ধরে| গঙ্গার বিস্তার আর প্রবাহ লেখাকে মনে যে প্রভাব সৃষ্টি করে সেই অনুভব কথায় ব্যখ্যা করা খুবই শক্ত| লেখার গুণগত মানে বোধহয় তার পরিচয় পাওয়া যায়|
যা হোক, তাই সুযোগ ছাড়তে চাইনি| আমি বললাম ওখানে কি কিছু দিন থাকা যাবে? সুমিত বললো, ওর দাদু দিদিমা এখন আর নেই| তবে এক মামা এখনো থাকেন| আর সুমিত-রা ওখানকার বনেদি ফ্যামিলি, একসময় প্রভাব প্রতিপত্তি ছিল, যদিও এখন তা অনেকটা সাদা মাঠা| ও বললো, দ্বিতল বাড়ি, যদিও বেশিরভাগ টাই ফাঁকা পরে আছে| যা হোক তো নিমতিতাই স্থির হোলো| নেক্সট ১৫ ২০ দিন নিমতিতা থাকার প্রিপারেশন আর অফিস-এর পেন্ডিং কাজে কেটে গেলো|
১২-ই june ২০১৬ তে রওনা দিলাম| Sealdha থেকে তিস্তা-তোর্সা এক্সপ্রেস ধরলাম| রাত ৮ তা নাগাদ নিমতিতা পৌছালাম| স্টেশন প্রায় ফাঁকা ফাঁকা| লোক বলতে জানা দশেক, তার মধ্যে বেশিরভাগই এই মাত্র train থেকে নামলো| কয়েক মুহূর্তে স্টেশন ফাঁকা হয়ে গেল| আস্তে আস্তে trolley-ব্যাগ আর আমার পিঠের ব্যাগ টা নিয়ে স্টেশন-এর বাইরের দিকে একটু এগিয়েছি দেখলাম একজন বয়স ৫০-এর ভদ্রলোক আমার দিকে এগিয়ে আসছে| পরনে ধুতি, আর একটা সাদা আদ্দির পাঞ্জাবি| আমার কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলেন "তুমিই কি অম্লান? সুমিত-এর বন্ধু| তোমাকে তুমি বলছি বলে কিছু মনে কোরোনা|" বুঝলাম উনি সুমিতের মামা| আমি বললাম "হ্যাঁ মামাবাবু| না না আমাকে 'তুমিই' বলবেন, আমিতো সুমিতেরই বয়সী"| আমি প্রণাম করলাম| উনি আশীর্বাদ করে বললেন "এস বাবা"| একটা রিকশার কাছে গিয়ে উনি দাঁড়াতেই, রিকশাওয়ালা প্রণাম ঠুকে ওনাকে বললেন "আমি নিয়ে যাচ্ছি বাবুকে, আপনি এগিয়ে যান|" রিকশাওয়ালা নিজেই আমার ব্যাগ টা রিকশাতে তুলে দিলেন| মামাবাবুর বাড়ি নিমতিতা থেকে আরও ৫-৭ km ভেতরে| আমি রিকশাতে বসলাম| খুব একটা গরম নেই এখানে| রিকশাওয়ালা কে জিজ্ঞাসা করতে বললো ১ সপ্তাহ আগে লাস্ট বৃষ্টি হয়েছিল| অন্ধকার পথে রিকশা চলছে, আলো প্রায় নেই| আমি রিকশাওয়ালা কে ভয় ভয় জিজ্ঞাসা করলাম এখানে electricity আছে তো| রিকশাওয়ালা বললো আছে তবে থাকে না বললেই চলে| বুঝলাম long-duration power cut| আকাশে চাঁদ উঠেছে| চাঁদের আলোতে হালকা যা পথ দেখা যাচ্ছে| চাঁদের আলো যে এতো সিগ্ধ, এতো কোমল, তা অনেকদিন বাদে মনে পড়লো| ছোটবেলাতে যখন current চলে যেত তখন এই চাঁদের আলো তে আমরা পাড়ার ছেলে মেয়েরা কতক্ষন খেলতাম| মনে পরে গেল আমি বড়দা আর সেজদি মিলে জোনাকি পোকা ধরতাম| ওই জোনাকি পোকা তখন আমাদের কাছে আজকের smarphone এর থেকেও আকর্ষণীয় ছিল| আর current চলে যাওয়ার ওই টুখুনি সময় ছিল সবচেয়ে অবিস্মরণীয়|
১৫ ২০ মিনিট চলার পর আমরা একটা ছোট মেঠো গলিতে ঢুকালাম| গলিটা পুরোই অন্ধকার| mobile er নেটওয়ার্ক নেই| চাঁদের আলোতে হালকা যা দেখা যাচ্ছিলো, তাতে দেখলাম একপাশে উঁচু পাঁচিল আর আরেক পশে ঝোপঝাড়| ৫ মিনিট মতো চলার পার একটা বড় গেটের সামনে এসে দাঁড়ালাম| দেখলাম মামাবাবু দাঁড়িয়ে আছেন পাশে একজন ভদ্রমহিলা একটা বড় টর্চ হাতে| বুঝলাম মামিমা| আমি নেমে প্রণাম করলাম ওনাকে| মামাবাবু বললেন "এস ভেতরে"| রিকশাওয়ালা আমার জিনিস গুলো নামিয়ে নিয়ে ভেতরে এলো| অন্ধকারে, চাঁদের আলোতে যা ঠাউরালাম, পুরানো দিনের বিশাল আকার দ্বিতল বাড়ি| অনেক অংশই অন্ধকার, শুধু মাত্র একটা দিকে টিম টিম আলো| রীতিমত গা ছমছমে একটা ব্যাপার| লেখক হতে গিয়ে শেষে এরকম একটা পরিস্থিতিতে এসে পড়বো তা আগে ভাবতে পারিনি| আবার সব ছেড়ে চলেও যেতে পারছি না| সুমিতের কাছে একটা মান সম্মানের ব্যাপার আছে|
দালান-এ উঠে একটা বসার ঘরে ঢুকলাম| দেখলাম তাতে একটা তক্তপোষ আর দুটো chair, আর একটা টেবিল| মামাবাবু আমাকে বসতে বললেন একটা chair-এ| রিকশাওয়ালা আমার জিনিস গুলো নামিয়ে রেখে মামাবাবুর কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে চলে গেলেন| মামাবাবুর সামনে রিকশা ভাড়ার কথাটা বলতে মনে বাঁধলো| মামিমা একটু জল আর সন্দেশ নিয়ে এলেন| বললেন "খেয়ে নাও বাবা, অনেক দূর থেকে আসছো"| একটু খানি সন্দেশ মুখে দিয়েই মন ভোরে গেলো| মাখা সন্দেশ| কি অপূর্ব তার স্বাদ| মনে হচ্ছিলো ক্ষীর খাচ্ছি| তারপর ঠান্ডা জাল খেয়ে বসলাম| দেখলাম পুরোনো দিনের করিবর্গার ছাদ| দেয়াল থেকে প্লাস্টার খসে গেছে অনেক জায়গাতেই| কোথায় সুমিত-এর টালিগঞ্জ-এর ফ্লাট আর কোথায় মুর্শিদাবাদের গ্রামের এই বাড়ি| লেখার চিন্তা তখন মাথা থেকে উঠে গাছে| ভাবছি কাটাবো কি করে এখানে? বাথরুম কেমন হবে? অসময় খিদে পেলে খাবো কি? রাত হওয়ার পর কোথাও যাবো কি করে? এইসব| সেইসময় মামবাবু ঘরে এলেন, বললেন "চলো তোমার থাকার ঘরটা দেখিয়ে দিই"| চলতে চলতে উনি বললেন, "সুমিত-এর কাছে শুনলাম তুমি লেখক, তাই তোমাকে একটা ভালো ঘর দিচ্ছি"| দালানটা সম্পূর্ণ পেরিয়ে একটা ছোট উঠোন, সেইটা পেরিয়ে আবার একটা দালান তার দ্বিতীয় ঘরটা উনি খুলে দিলেন| ঘরে ঢুকেই মনটা ভোরে গেলো| একটা তক্তপোষ, তার ওপর একটা সাদা পরিষ্কার চাদর বিছানো, একটি টেবিল আর একটা চেয়ার| টেবিল-এর ওপর সাদা টেবিল-ক্লোথ আর তার ওপর ফুলদানি আর তাতে এক গুচা জুঁই ফুল| দক্ষিণ মুখি দুটো জানলা দিয়ে খুব সুন্দর হাওয়া আসছে| কি মিষ্টি সেই হাওয়া| জুঁই ফুলের গন্ধে ঘর ভোরে গেছে| ক্ষনিকের জন্য মনে হলো অনেক বড় কোনো হোটেল-এর ঘরে ঢুকলাম| মামিমা যে ঘরটাকে সাজিয়ে রেখেছেন তা বোঝা গেলো| মনে হোলো উনি যেন আমার নিজের আপন মামিমা|
ব্যাগ পত্র রেখে জামা কাপড় ছেড়ে ঘরের পায়জামা-পাঞ্জাবি পড়লাম| মামাবাবু ততক্ষনে চলে গেছেন| বাথরুম-এর কথা জিজ্ঞাসা করতে ভুলে গেছি| দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে কি করবো ভাবছি, দেখলাম দালানের শেষের দিকে একটা হ্যারিকেন মতো জ্বলছে| টর্চ জ্বালিয়ে এগিয়ে গেলাম| হ্যারিকেনের কাছে পৌঁছে দেখলাম পাশে একটা গালি মতো, একটু এগোতেই দেখলাম জায়গাটা বাঁধানো আর তার শেষে সারিসারি ৫ টা ঘর| বুঝলা এই হলো বাথরুম| যদিও ঘর থেকে একটু দূরে কিন্তু বেশ maintained |
হাথ পা ধুয়ে এসে ঘরে বসলাম| অনেক পুরানো দিনের বাড়ি হলেও, বাড়ি টা বেশ নিকানো, maintained , যতটা সম্ভব ভদ্র ভাবে থাকার জন্য| বিলাসিতা নেই কিন্তু দরকারি সব কিছুই আছে| রাত্রে মামিমা-র হাতের অসাধারণ পাঁঠার মাংস, মুগের ডাল, বেগুন ভাজা, ভাত আর লেডিকিনি খুব খেয়ে দক্ষিণের খোলা হওয়াতে এতো ঘুমিয়ে ছিলাম যে পরের দিন সকালে প্রায় ১১ টা তে মামিমার ডাকে ঘুম ভাঙে| মামিমা চা দিয়ে গেলেন| আমি হাত মুখ ধুয়ে এসে চা খেলাম| দিনের আলোতে বাড়িটাকে খুব সুন্দর লাগছিলো| যদিও পুরানো কিন্তু একটা প্রকৃতির ছোঁয়া আছে| সবুজ উঠোন, পরিষ্কার দালান, পরিষ্কার পুকুরের টলমল জাল, মেঠো পথ, আমি, জাম, কাঁঠাল, নারকেল এর সারি সারি গাছ, পাখির ডাক, নির্মল হাওয়া| আহা, মন আমার এতো ভোরে যেতে লাগলো| মনে হচ্ছিলো কোনো রিসোর্ট-এ এসেছি|
বিকেলের দিকে একবার পুকুর ধরে গেলাম| মেঠো পথে পেরিয়ে পুকুরের ধরে এসে দাঁড়ালাম| পুকুরের চারপাশে নারকোল গাছ| হওয়াতে দুলছে গাছগুলোর পাতাগুলো| হওয়ার টানে সমান তালে সূক্ষ সূক্ষ ডেউ উঠছে পুকুরের জলে| চারদিকে শুধু পাখির কলকাকলি আর গাছের পাতার শব্দ| একটা মাছরাঙা ঝুপ করে এসে মাছ তুলে নিয়ে গেল জল থেকে| পানকৌড়ি উঠেই ডুব দিলো| গভীর ভাবে হৃদয়ে উপভোগ করছি এই প্রাকৃতিক সুন্দর্য|
রোজই বিকালের দিকে পুকুর ধার টা তে আসতে ভালো লাগে| পুকুরের একদিকে একটা বাঁধানো পার আছে| পারটা বেশ পরিষ্কার| ওখানেই এসে বসি| জলের কাছে| মাছের ঝাঁক দেখতে পাই| হাতে করে কিছু শুকনা মুড়ি আনি| ওদেরকে দিই| সময় যে কোথা দিয়ে কেটে যায় বুঝতেই পারি না| আর সময়ের চিন্তাও করি না| মনে হচ্ছে প্রকৃতি মাতার সংস্পর্শে আমার আত্মার পরিশুদ্ধি হচ্ছে| অন্তর আত্মা যেন সম্পদে ভোরে উঠছে| প্রকৃতির ঐশ্বর্যে বিভোর হয়ে কেটে যেত বেলা|
একদিন পুকুর পারে বসে আছি, একটা গুন্ গুন্ শব্দ আসছিলো কানে| খুব হালকা, দূর থেকে| কিন্তু আসছিলো| আওয়াজের উৎস খোঁজ করার জন্য পুকুরটা ছাড়িয়ে এগিয়ে গেলাম| দেখলাম একটা ছোটোখাটো আম বাগান| আর তার একটা আম গাছে একটা দোলনা বেঁধে একটা মেয়ে দুলছে| আর গুন্ গুন্ করে গান গাইছে|
আমি ওনার গজ দশেক দূরে দাঁড়িয়ে| পরিপাটি করে বাধা চুলে বেশ বড় বিনুনি আর golapi রঙের চুড়িদার| বয়স আন্দাজ করতে পারছিলাম না| কিন্তু ওনার দোলনার চলন যেন এক তালে চলছিল গানের সাথে সাথে| ১৫-২০ মিনিট এইভাবে দাঁড়ানোর পর আমি আস্তে আস্তে এগিয়ে গেলাম ওনার দোলনার কাছে| ওনার সামনে এসে দাঁড়াতে উনি হাসলেন আমাকে দেখে| যেন আমি কত কালের চেনা| নির্মল মুখশ্রী| বয়স ২২-২৪| দোলনা থামিয়ে আমাকে বললেন "আপনি সুমিতদাদার বন্ধু তো?" আমি বললাম "হ্যাঁ, কিন্তু আপনি কি করে জানলেন?" উনি বললেন "আমি সুমিতদাদার মামাতো বোন| মা আপনার কথা বলেছে"| আমি বললাম "আচ্ছা"| বললাম "আপনাদের এই জায়গাটা খুব সুন্দর"| উনি বললেন "হ্যাঁ"| বললেন "আপনি আমাদের আমবাগান দেখেছেন"? আমি বললাম "না, এই তো কদিন হলো এসেছি| সবকিছু ঠিক মতো দেখা হয়ে উঠেনি"| উনি বললেন "চলুন আপনাকে ঘুরে দেখাই"| আমরা হাঁটতে থাকলাম| দেখলাম ওনার চাল চলন আদৌ গ্রাম্য নয়, বেশ একটা মার্জিত ভাব আছে|
আমি জিজ্ঞাসা করলাম "তা এই কদিন আপনাকে দেখিনি কেন?", উনি বললেন "আমি তো এখানে থাকি না, আমি তো পড়াশুনার জন্য কোলকাতাতে মাসির কাছে থাকি| কদিনের ছুটিতে এসেছি"| আমি বললাম "কলেজ-এ পড়ছেন?"| উনি বললেন "হ্যাঁ"| উনি অনেক গুলো আমি গাছ আমাকে দেখালেন আর তাদের বৈশিষ্টও আমাকে বললেন| ওনার সাথে কথা বলতে বলতে মনে হচ্ছিলো আমরা যেন পরস্পরের অনেক দিনের চেনা|
যা হোক, বিকালটা এই ভাবেই কেটে গেলো| রাত্রে বিছানায় শুয়ে আছি| চারিদিক শান্ত, শুধু ঝি ঝি পোকার ডাক| এই নির্মল পরিবেশে মন শুধু ভাবছে বিকালের কথা| যেন এক মিষ্টি অনুভব| এই অনুভবের মিষ্টতা আরও বেড়ে যাচ্ছে প্রকৃতির এই নিবিড় বন্ধনে|
পরের দিন বিকালে পুকুর পারে এসে দাঁড়ালাম| মাছগুলো যেন আমার time বুঝে গেছে| আজ আর ঘটে না বসে, ওপর থেকে মুড়ি গুলো ছাড়িয়ে দিতে লাগলাম| ফাঁকে ফাঁকে আম বাগানের দিকে তাকালাম| আজ আর কাউকে দেখতে পেলাম না| কি করবো ভাবছি| হঠাৎ পিছন থেকে ওনার গলা শুনলাম| উনি মিষ্টি হেসে বললেন "আপনি এখানে, আর আমি আপনার ঘরের দিকে গেছিলাম, ঘরে গিয়ে দেখলাম বাইরে থেকে বন্ধ"| আমি মিষ্টি হাসিতে উত্তর দিলাম, "হ্যাঁ এই সময়টায় আমি পুকুরের দিকটায় আসি"| উনি বললেন "চলুন আপনাকে আজ গঙ্গার পারে নিয়ে যাবো| গঙ্গা আমাদের বাড়ির খুব কাছে"| আমি বললাম "চলুন"|
আজ উনি একটা সুন্দর সিল্ক-এর শাড়ি পড়েছিলেন| খুব smart লাগছিলো ওনাকে| অথচ কত সরল, স্বাভাবিক ভাবে উনি আমার সাথে মিলছেন| ওনার মধ্যে গ্রাম্য সরলতা আর শহরের স্মার্টনেস-এর এক সুন্দর সমন্বয় খুঁজে পাচ্ছিলাম| গ্রামের মেঠো পথ ধরে আমরা হাঁটছিলাম| উনি আমাকে বিভিন্ন ফুল গাছ দেখাচ্ছিলেন| ১০-১৫ মিনিট হাঁটার পার আমরা গঙ্গার ধরে পৌছালাম| গঙ্গা অনেক চওড়া| বিসতৃত তার প্রবাহ| ওপারটা প্রায় দেখাই যায় না| বুক ভোরে নিঃশাস নিলাম আমরা দুজনে| পারে ঘাসের ওপর বসে নদীর ঢেউ, ঢেউয়ের আনাগোনা, নৌকার বয়ে যাওয়া নিঃশব্দে লক্ষ্য করতে লাগলাম| কিছুক্ষন বাদে মুখঘুরিয়ে ওনার দিকে তাকাতেই আর চোখ ফেরাতে পারলাম না| পড়ন্ত সূর্যের সোনালী আলো ওনার মলিন মুখে পড়েছে,হওয়াতে কিছু চুল এলো মেলো হয়ে মলিন স্বর্ণাভ মুখোমণ্ডলীকে স্নিগ্ধ করে তুলেছে| মা প্রকৃতি এতো সুন্দর, কিন্তু তার অনুভব যে মানুষকেও এতো সুন্দর করে তোলে তা কাছ থেকে অনুভব করছিলাম| উনি আমার চোখে চোখ রাখলেন| ওনার চোখে আমি ওনার অন্তরকে খুঁজে পাচ্ছিলাম| ঐশ্বর্যে ভরা অন্তর| ওনার চোখে চোখ রেখে মনে হচ্ছিলো যেন আমি প্রজাপতি আর ওনার চোখ যেন একটা সুন্দর ফুল আর ওনার অন্তর হচ্ছে মধু| এত মিষ্টতা সেই মধুতে যেন জন্ম জন্মান্তরেও আমি তৃপ্ত হবো না| আমার সমস্ত অন্তর দিয়ে মনে মনে ওনার চোখে চোখ রেখে নিঃশব্দে ওনাকে প্রেম নিবেদন করলাম| চোখের ভাসতে নিঃশব্দে উনি তা শিকার করলেন|
বেলা পরে আসছিলো| গ্রামের মেঠো পথ ধরে হাটতে হাটতে আমরা বাড়ি ফিরলাম| নিঃশব্দে পাশাপাশি হাঁটছিলাম আমরা| উনি খুব হালকা সুরে একটা গানের সুর গুন্ গুন্ করছিলেন....আমার মনও তাতে সুর মেলালো..."এই তো হেথায় কুঞ্জ ছায়ায় স্বপ্ন মধুর মোহে...এই জীবনে যে কটি দিন পাবো...তোমায় আমায় হেসে খেলে কাটিয়ে যাবো দোঁহে...স্বপ্ন মধুর মোহে"|