06/09/2026
মানুষ ভাবে পৃথিবীর সবচেয়ে মারাত্মক মহামারী বুঝি প্লেগ, কলেরা বা হালে আসা কোনো অচেনা ভাইরাস। ভুল! ঘোর ভুল! পৃথিবীর সবচেয়ে সফল, আন্তর্জাতিক এবং জনপ্রিয় মহামারীর নাম হলো দাঁতের পোকা (বিজ্ঞানীদের ভাষায় ক্যাভিটি, আর আমাদের পাড়ার ঠাকুমার ভাষায়: "ওই যে মিষ্টি খেয়ে কুলি না করার ফল!")।
ঘটনাটা শুরু হয়েছিল প্রীতমবাবুর মুখের ভেতর, নিচের পাটির বাঁ-দিকের দাঁতে যার নাম রাখা যেতে পারে ‘আইভরি টাওয়ার’।
সেই দাঁতের উপত্যকায় বাস করত লক্ষ-কোটি স্ট্রেপ্টোকক্কাস মিউটান্স। খালি চোখে এদের দেখা যায় না বটে, কিন্তু এদের রাজনৈতিক ক্ষমতা যেকোনো দেশের মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ে বেশি। প্রীতমবাবু যখনই ভাবতেন, “রাত বারোটা বাজে, ফ্রিজ থেকে একটা রসগোল্লা বা দুটো চকোলেট মেরে দিলে কার কী বা যায় আসে!” ঠিক তখনই দাঁতের কোণে বেজে উঠত মহাভোজের সানাই।
জীবাণুদের লিডার চেঁচিয়ে বলত, “ভাইসব! রসগোল্লার সিরাপ নামছে! কাজে লেগে পড়ো!”
ব্যস, কোটি কোটি ব্যাকটেরিয়া চিনি খেয়ে দেদার ল্যাকটিক অ্যাসিড বানাতে শুরু করল। মানুষের শরীরের সবচেয়ে শক্ত অংশ হলো এনামেল লোহার চেয়েও শক্ত। কিন্তু অ্যাসিডের কাছে তো বাঘও ভিজে বেড়াল! সেই এনামেলের ওপর ড্রিল মেশিন চালানোর মতো করে অ্যাসিড খোদাই করতে লাগল এক গোপন সুরঙ্গ।
এদিকে প্রীতমবাবু পরম শান্তিতে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছেন। কারণ দাঁতের ওপরের চামড়ায় কোনো নার্ভ নেই। যাকে বলে, “চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে, আর এনামেল ফুটো হলে তবেই মানুষ বোঝে!”
সপ্তাহ তিনেক পর, প্রীতমবাবু একদিন ঠান্ডা ফ্রিজের জল ঢকঢক করে গলায় ঢাললেন।
আর তখনই ঝনঝনঝনাৎ!
সরাসরি মহাকাশ থেকে যেন এক পশলা চারশো চল্লিশ ভোল্টের কারেন্ট এসে লাগল তাঁর মস্তিষ্কে। প্রীতমবাবু জলের গ্লাস ফেলে দিয়ে গাল চেপে ধরে কঁকিয়ে উঠলেন, “ওরে বাবারে! কে যেন আমার চোয়ালে পরমাণু বোমা ফেলল!”
আরে মশাই, অ্যাসিড তো ততদিনে দাঁতের মজ্জা বা নার্ভ অবধি হাইওয়ে বানিয়ে ফেলেছে!
অগত্যা পরের দিন সকালে দন্ত্য-চিকিৎসক অর্থাৎ ডেন্টিস্টের চেম্বার। ডাক্তারবাবুর চেম্বারে ঢোকা মাত্রই সেই চিরচেনা গন্ধ আর এক অদ্ভুত ড্রিল মেশিনের ঘ্যাঁড়-ঘ্যাঁড় আওয়াজ শুনে প্রীতমবাবুর পেটের ভেতর গুড়গুড় করতে লাগল।
ডাক্তারবাবু মুখে একখানা আয়না আর সূঁচালো রড ঢুকিয়ে দাঁতে টোকা মারলেন।
প্রীতমবাবু লাফিয়ে উঠলেন, “উঁউঁউঁ... ডাক্তারবাবু, লাগছে!”
ডাক্তারবাবু মাস্কের আড়াল থেকে মুচকি হেসে বললেন, “লাগবেই তো! ভেতরে তো আস্ত একটা মেট্রো রেলের টানেল বানিয়ে বসে আছেন। কটা মিষ্টি খান দিনে?”
“আজ্ঞে... ওই টুকটাক... দুটো-চারটে...”
“হুম, আপনার দাঁতের পোকারা তো বেশ মোটাতাজা। পৃথিবীর এক নম্বর অসুখ বাধিয়ে বসে আছেন।”
প্রীতমবাবু চোখ গোল গোল করে বললেন, “অ্যাঁ? এইটুকু গর্ত পৃথিবীর এক নম্বর?”
“আলবাত!” ডাক্তারবাবু জ্ঞান বিতরণ শুরু করলেন, “বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলে, মানুষের তৈরি চাকা আবিষ্কারের পর সবচেয়ে ছড়িয়ে পড়া জিনিস হলো এই ক্যাভিটি। কোটি কোটি মানুষ এই যন্ত্রণায় ভোগে, আপনি একা নন, বিরাট টিম আপনার পেছনে!”
তারপর শুরু হলো মহাভারত যুদ্ধ।
ডাক্তারবাবু তুলে নিলেন তাঁর সেই ভয়ংকর অস্ত্র জল ছিটানো ডায়মন্ড ড্রিল।
ঘিঁড়ড়ড়... ঘ্যাঁড়ড়ড়...
প্রীতমবাবু চেয়ারের হাতল এমনভাবে খামচে ধরলেন, যেন রোলার কোস্টার থেকে পড়ে যাচ্ছেন। মুখের ভেতর থেকে ধোঁয়া, জল আর পোড়া গন্ধের এক এলাহী কারবার! ড্রিল দিয়ে ব্যাকটেরিয়াদের তাসের ঘরের মতো কলোনি গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো। তারপর সেখানে সিমেন্টের মতো সাদা মশলা (কম্পোজিট) ঠুকে, নীল রঙের লাইট জ্বেলে একেবারে পিচ ঢালা পাকা রাস্তা বানিয়ে সিল করে দেওয়া হলো।
বিল মেটানোর সময় প্রীতমবাবুর পকেটের অবস্থা দাঁতের চেয়েও বেশি ফাঁকা হয়ে গেল।
চেম্বার থেকে বেরিয়ে প্রীতমবাবু জিব দিয়ে নতুন বাঁধানো দাঁতের মসৃণ দেওয়ালটা ছুঁয়ে দেখলেন। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলেন "আজ থেকে দিনে দু'বার ব্রাশ, চিনি ছোঁব না, আর কুলি না করে ঘুমোলে আমার নাম প্রীতম নয়!"
তবে ওদিকে পেছনের মাড়ির এক চিলতে কোণে লুকিয়ে থাকা চার-পাঁচটা ব্যাকটেরিয়া তখন মিটিমিটি হাসছিল। তারা ফিসফিস করে বলল, “হিসাব তো বুঝলাম ভাই, কিন্তু কাল দুপুরে যখন আবার রসমালাই খাবে, তখন আমরাও তো এখানেই আছি!”