21/10/2025
সরকারের নিকট জরুরি সুপারিশমালা: চিকিৎসা প্রযুক্তিবিদ পেশার মানোন্নয়ন
------------------------------------
প্রেরক: একটি স্বতন্ত্র পেশার মানোন্নয়নে আগ্রহী মহল
তারিখ: ২১অক্টোবর ২০২৫
১. ভূমিকা
চিকিৎসা প্রযুক্তিবিদগণ দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। রোগ নির্ণয়ের নির্ভুলতা এবং চিকিৎসার সফলতার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তাঁরা। অন্য কোনো পেশার সাথে স্বার্থের সংঘাত না থাকা সত্ত্বেও এই পেশার মানোন্নয়ন এবং স্বীকৃতিতে ঘাটতি রয়েছে। স্বাস্থ্যখাতকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে, এই পেশার দ্রুত মানোন্নয়নের জন্য সরকারের জরুরি ও কাঠামোগত মনোযোগ প্রয়োজন।
নিচে চিকিৎসা প্রযুক্তিবিদদের পেশাগত মর্যাদা, শিক্ষা ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো উন্নয়নের লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট সুপারিশমালা তুলে ধরা হলো।
২. মূল সুপারিশমালা
ক. পেশাগত নিয়ন্ত্রণ ও আইনি কাঠামো শক্তিশালীকরণ (Regulatory & Legal Structure)
| ক্রম | সুপারিশ | লক্ষ্য ও যৌক্তিকতা |
|---|---|---|
| ১.১ | শক্তিশালী পেশাদার কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা | অবিলম্বে একটি স্বাধীন ও আইনগতভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত "বাংলাদেশ মেডিকেল টেকনোলজি কাউন্সিল (BMTC)" বা অনুরূপ একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই কাউন্সিল প্রযুক্তিবিদদের রেজিস্ট্রেশন, লাইসেন্সিং, পরীক্ষা গ্রহণ এবং পেশাগত শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে একক কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করবে। |
| ১.২ | বাধ্যতামূলক লাইসেন্সিং প্রবর্তন | সরকারি, বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সকল স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সকল মেডিকেল টেকনোলজিস্টের জন্য কাউন্সিলের অধীনে পেশাগত লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করতে হবে। লাইসেন্স ছাড়া কাউকে চিকিৎসা প্রযুক্তিবিদ হিসেবে কাজ করার অনুমতি দেওয়া যাবে না। |
| ১.৩ | সুনির্দিষ্ট পেশাগত আইন প্রণয়ন | চিকিৎসা প্রযুক্তিবিদদের দায়িত্ব, কর্মপরিধি এবং পেশাগত মান লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা সংক্রান্ত একটি সুস্পষ্ট আইন প্রণয়ন করতে হবে। এতে এই পেশার স্বাতন্ত্র্য নিশ্চিত হবে। |
খ. শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মান নিয়ন্ত্রণ (Education & Training Quality)
| ক্রম | সুপারিশ | লক্ষ্য ও যৌক্তিকতা |
২.১ | জাতীয় অভিন্ন কারিকুলাম ও আধুনিকায়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি কমিটি গঠন করে বিশ্বমানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি অভিন্ন জাতীয় কারিকুলাম প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। কারিকুলামে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ (Hands-on Training) এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। |
২.২ | মানহীন প্রতিষ্ঠান বন্ধ ও অনুমোদন প্রক্রিয়া কঠোরকরণ ঃ
যেসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পর্যাপ্ত শিক্ষক, আধুনিক ল্যাব ও অবকাঠামো ছাড়াই কোর্স পরিচালনা করছে, সেগুলোর তালিকা প্রস্তুত করে অবিলম্বে তাদের অনুমোদন বাতিল করতে হবে। নতুন প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের মানদণ্ড কঠোর করতে হবে।
২.৩ | CPD (ক্রমাগত পেশাগত উন্নয়ন) বাধ্যতামূলককরণঃ
সকল নিবন্ধিত প্রযুক্তিবিদের লাইসেন্স নবায়নের জন্য নিয়মিত আধুনিক প্রযুক্তির ওপর প্রশিক্ষণ বা CPD কোর্স সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে তাদের দক্ষতা সর্বদা হালনাগাদ থাকে।
গ. পেশাগত মর্যাদা ও কর্মসংস্থান কাঠামো (Professional Status & Career Structure)
| ক্রম | সুপারিশ | লক্ষ্য ও যৌক্তিকতা
৩.১ | পদমর্যাদা ও বেতন স্কেল পুনঃনির্ধারণঃ
চিকিৎসা প্রযুক্তিবিদদের শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং কাজের গুরুত্ব বিবেচনা করে তাদের পদমর্যাদা অবিলম্বে উন্নত করতে হবে (যেমন: ডিপ্লোমাধারীদের ন্যূনতম ১০ম গ্রেড এবং বিএসসি/সমমানধারীদের ৯ম গ্রেড বা তদূর্ধ্ব)। |
৩.২ | সুস্পষ্ট পদোন্নতির কাঠামো তৈরি, জুনিয়র থেকে সিনিয়র টেকনোলজিস্ট, প্রধান টেকনোলজিস্ট (Chief Technologist) এবং ল্যাব/বিভাগীয় প্রধান পর্যন্ত একটি সুনির্দিষ্ট, সময়ভিত্তিক ও মেধাভিত্তিক পদোন্নতির ব্যবস্থা চালু করতে হবে। এটি কর্মীদের মধ্যে কাজের প্রেরণা বাড়াবে।
৩.৩ শূন্য পদে নিয়োগ ও নতুন বিশেষায়িত পদ সৃষ্টি ঃ
সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকা সকল চিকিৎসা প্রযুক্তিবিদের পদ দ্রুত পূরণ করতে হবে এবং আধুনিক ডায়াগনস্টিকস (যেমন: মলিকুলার ল্যাব, জেনেটিক টেস্টিং) এর জন্য নতুন বিশেষায়িত পদ সৃষ্টি করতে হবে। |
৩.৪ | পদবিতে একরূপতা আনা ঃ
সকল সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পেশাগত পদবিতে একরূপতা আনতে হবে (যেমন, শুধুমাত্র ‘মেডিকেল টেকনোলজিস্ট’ বা ‘চিকিৎসা প্রযুক্তিবিদ’)। |
৩. উপসংহারঃ
চিকিৎসা প্রযুক্তিবিদদের মানোন্নয়ন কোনো একক পেশার দাবি নয়, বরং এটি দেশের নাগরিকদের জন্য নিরাপদ ও নির্ভুল স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার অপরিহার্য পদক্ষেপ। যেহেতু এই পেশার সাথে অন্য কোনো পেশার স্বার্থের সংঘাত নেই, তাই নিয়ন্ত্রণমূলক ও কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করার মাধ্যমে সরকার দ্রুততম সময়ে উল্লিখিত সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করতে পারে। এসব পদক্ষেপ একদিকে যেমন যোগ্য টেকনোলজিস্টদের উৎসাহিত করবে, তেমনি সামগ্রিকভাবে দেশের স্বাস্থ্যখাতের ভিত্তি আরও মজবুত করবে।
মোঃ জহিরুল ইসলাম তালুকদার
যুগ্ম মহাসচিব, বিএমটিএ কেন্দ্রীয় সংসদ