30/07/2026
টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া আর টেলিভিশন চ্যানেল গুলো আজকে বেশ গরম, তা দেখে মনে হলো বিষয়টি নিয়ে একটু পরিষ্কার করে বলা দরকার।
চলুন, ঠান্ডা মাথায় আর লজিক্যালি একটু খতিয়ে দেখি -টুথপেস্ট থেকে তাৎক্ষণিক মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির ভয় পাওয়াটা কতটা যৌক্তিক। নাকি এটা দেশীয় ব্র্যান্ডের বিরুদ্ধে ইন্ডিয়ার কোনো চক্রান্ত ?
শুরুতেই আসি বেসিক একটা জায়গায়। মাইক্রোপ্লাস্টিক আসলে কী?
সহজ ভাষায়, ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিকের কণাকেই 'মাইক্রোপ্লাস্টিক' বলা হচ্ছে। আমরা যেসব প্লাস্টিকপণ্য ব্যবহার করি, তা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে কিংবা বিভিন্ন প্রসাধনীতে ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবহার করার মাধ্যমে এগুলো তৈরি হয়। এগুলো এতটাই ক্ষুদ্র যে খালি চোখে বা সাধারণ অবস্থায় আমরা টেরই পাই না কীভাবে এগুলো আমাদের শরীরে প্রবেশ করছে।
প্রতিদিন আর কী কী ভাবে আমরা মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণ করছি?
টুথপেস্টের খবরটা শুনে আমরা যতটা ভয় পাচ্ছি, কিন্তু বাস্তবতা হলো —দৈনন্দিন জীবনে আমাদের অজান্তেই বিভিন্নভাবে এর চেয়ে বহুগুণ বেশি প্লাস্টিক কণা শরীরে ঢুকছে :
>খাবার ও পানীয়: আমরা প্রতিদিন যে বোতলজাত পানি খাচ্ছি, সেখান থেকে বছরে প্রায় ৯০ হাজার প্লাস্টিক কণা পেটে যেতে পারে। এছাড়া সামুদ্রিক মাছ, চিংড়ি, লবণ, মধু, এমনকি চায়ের কাপ/ টি ব্যাগ থেকেও আমরা মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণ করছি।
>বাতাস ও ঘরের ধুলো: আমরা যে সিনথেটিক কাপড় পরি (যেমন পলিয়েস্টার বা নাইলন), সেখান থেকে ঘর্ষণের ফলে অতি ক্ষুদ্র ফাইবার বাতাসে মেশে। ঘরের ধুলোবালি বা খাবার খাওয়ার সময় বাতাসে থাকা সেই কণাগুলো মিশে বছরে প্রায় ১৩ হাজার থেকে ৬৮ হাজার পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক আমাদের পেটে চলে যায়।
>প্রসাধন সামগ্রী: ফেসওয়াশ, বডিওয়াশ বা স্ক্রাবের মতো অনেক প্রসাধনীতেও মাইক্রোবিডস বা প্লাস্টিক কণা থাকে, যা নিয়মিত আমাদের ত্বকের সংস্পর্শে আসছে।
>আমরা যে টুথব্রাশটি ব্যবহার করছি, সেটির ব্রিসল বা সুতোগুলো কিন্তু নাইলনের (যা এক প্রকার সিন্থেটিক প্লাস্টিক)। প্রতিদিন দাঁত ও মাড়ির সাথে এই ব্রিসলগুলোর তীব্র ঘর্ষণের ফলে নাইলনের সূক্ষ্ম কণা বা ফাইবার ক্ষয় হয়ে লালার সাথে মিশে পেটে যাওয়াটা অসম্ভব নয়। কিন্তু তাই বলে কি আমরা দাঁত মাজা বাদ দিয়ে দেব? যেখানে বাতাস, পানি ও দৈনন্দিন জীবনের নানা মাধ্যম থেকে হাজার হাজার প্লাস্টিক কণা আমাদের অজান্তে শরীরে যাচ্ছে, সেখানে শুধু টুথপেস্ট বা ব্রাশ নিয়ে অতিরিক্ত আতঙ্কিত হওয়াটা কতটা যৌক্তিক?
তাহলে কেবল টুথপেস্ট নিয়ে কেন এত আতঙ্ক? চলুন একটু হিসাবটা মেলাই:
১. ভয়ের আসল মাত্রা কতটুকু?
সম্প্রতি একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, 'মেডিপ্লাস' টুথপেস্টের ১০০ গ্রামে সর্বোচ্চ ৩২০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। এখন একটু হিসেব করুন—আমরা দিনে কয় গ্রাম টুথপেস্ট ব্যবহার করি? বড়জোর ১ গ্রাম! অর্থাৎ, দিনে দু'বার ব্রাশ করলেও আমাদের মুখে যায় বড়জোর ৬ থেকে ৭টি কণা। আর টুথপেস্ট তো আমরা গিলে ফেলি না, ব্রাশ শেষে কুলি করে ফেলে দিই। যেখানে বাতাস আর পানি থেকেই হাজার হাজার কণা আমাদের অজান্তে শরীরে যাচ্ছে, সেখানে টুথপেস্ট থেকে তাৎক্ষণিক মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির ভয় পাওয়াটা কি খুব যৌক্তিক?
২. একটিমাত্র স্টাডি কি শেষ কথা?
ESDO-এর এই একটিমাত্র গবেষণার রিপোর্ট সামনে আসতেই যেভাবে সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন, বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে তা কি ঠিক? একটি মাত্র গবেষণার ওপর ভিত্তি করে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া যায় না। বিষয়টি নিয়ে আরও বিস্তৃত, নিরপেক্ষ এবং মাল্টি-লেভেল গবেষণা হওয়া জরুরি।
৩. দেশীয় ব্র্যান্ডের বিরুদ্ধে কোনো চক্রান্ত নয় তো?
'মেডিপ্লাস' বাংলাদেশের অত্যন্ত পরিচিত এবং জনপ্রিয় একটি দেশীয় ব্র্যান্ড- যা শুধু বাংলাদেশে না , দেশের গন্ডী পেরিয়ে নেপাল , দুবাই এ এক্সপোর্ট হচ্ছে। হঠাৎ করে একটিমাত্র স্টাডিকে সামনে এনে যেভাবে দেশীয় ব্র্যান্ডগুলোর বিরুদ্ধে একটা নেতিবাচক পরিবেশ তৈরি করা হলো, তাতে কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়। আমাদের এই বিশাল টুথপেস্টের বাজারকে টার্গেট করে, পরিকল্পিতভাবে দেশীয় ব্র্যান্ডগুলোর সুনাম নষ্ট করে বিদেশি (বিশেষ করে পার্শ্ববর্তী দেশ ইন্ডিয়ার) ব্র্যান্ডগুলোর জন্য বাজার দখলের কোনো অদৃশ্য খেলা চলছে কি না—সেই সন্দেহও কিন্তু উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
৪. আসল ক্ষতি কোথায়?
টুথপেস্টের কণা সরাসরি আমাদের পেটে না ঢুকলেও, ব্রাশ শেষে বেসিনের ড্রেন দিয়ে তা ঠিকই নদী বা সমুদ্রে গিয়ে মিশছে। এতে পরিবেশ ও জলজ প্রাণীর মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে এবং জলজ খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে ঘুরপথে তা আবার আমাদের শরীরেই ফিরে আসছে। তাই আসল নজর দেওয়া উচিত পরিবেশ সুরক্ষার জায়গাটিতে। বিএসটিআই (BSTI) ইতোমধ্যে বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে এবং ক্ষতিকর উপাদানের ব্যবহার রোধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
আমাদের করণীয়:
অযথা প্যানিক না হয়ে সচেতন হোন। দেশীয় শিল্পের ওপর আস্থা রাখুন, আমরাও চাই দেশীয় টুথপেষ্টগুলো যেন মাইক্রোপ্লাস্টিক মুক্ত হয়, পাশাপাশি টুথপেষ্ট কোম্পানি , নীতিনির্ধারক ও বিএসটিআই-এর কাছে জোরালো দাবি জানাই—তারা যেন অতি দ্রুত আরও মানসম্মত ও প্লাস্টিকমুক্ত টুথপেস্ট বাজারে নিশ্চিত করে।
দেশীয় পণ্য ব্যবহার করুন, যাচাই-বাছাই করুন, আর গুজবে কান না দিয়ে নিজের বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সত্যটা বোঝার চেষ্টা করুন। 🇧🇩
CPD