18/07/2021
আরাফার দিন হলো বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ দিনগুলোর একটি!
আজ ১৯ জুলাই, রোজ সোমবার হাজীগণ আরাফার মাঠে অবস্থান করবেন। তাই আজকের দিন পবিত্র আরাফার দিন।
আরাফার দিনের সুমহান মর্যাদা ও আমলসমূহঃ
------------------------------------------------------------------
(১) আরাফার দিনের রোজা দ্বারা দুই বছরের গুনাহ ক্ষমা করা হয় :
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘আরাফার দিনের রোজার বিষয়ে আমি আল্লাহর নিকট আশা করি যে, তিনি এর দ্বারা বিগত বছর ও আগামী এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেবেন।’’ [সহিহ মুসলিম : ১১৬২]
তবে, আরাফার মাঠে অবস্থানকারী হাজিগণ রোজা রাখবেন না। নবিজি রাখেননি, বরং এদিন দুধ পান করেছেন মর্মে হাদিস আছে। [মুসলিম, আস-সহিহ: ২৬৫১]
(২) এদিন সর্বাধিক পরিমাণ জাহান্নামিকে মুক্তি দেওয়া হয় :
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘অন্যান্য দিনের তুলনায় আরাফার দিনে আল্লাহ তা‘আলা বান্দাকে সবচেয়ে বেশি জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন।’’ [মুসলিম, আস-সহিহ: ৩৩৫৪; নাসাঈ, আস-সুনান: ৩০০৩]
(৩) আরাফাবাসীকে নিয়ে আল্লাহ তাআ'লা গর্ব করেন :
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা আরাফায় অবস্থানকারীদের নিয়ে আসমানের ফেরেশতাদের সাথে গর্ব করেন। তিনি তাদের বলেন, ‘‘আমার এই বান্দাদের দিকে তাকিয়ে দেখো, তারা আমার কাছে এসেছে উশকোখুশকো ও ধূলিমলিন অবস্থায়।’’ [আলবানি, সহিহুত তারগিব: ১১৩২]
(৪) আরাফার দিনের দু‘আ মর্যাদাপূর্ণ :
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘সর্বোত্তম দু‘আ হলো আরাফার দিনের দু‘আ। আমি ও আমার পূর্ববর্তী নবিগণ এদিনে উত্তম যে দু‘আটি পড়েছি, তা হলো—
لاَ إِلٰهَ إِلاَّ اللّٰهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيْكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَىْءٍ قَدِيرٌ
[লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়াহদাহূ লা শারীকা লাহূ লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুওয়া ‘আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বাদীর]
অর্থ : আল্লাহ ব্যতীত কোনো সত্য উপাস্য নেই। তিনি এক; তাঁর কোনো অংশীদার নেই। তাঁর জন্যই সকল প্রশংসা ও রাজত্ব; তিনি সকল বিষয়ে সর্বশক্তিমান।’’ [সুনানে তিরমিযি : ৩৫৮৫; আলবানি, সিলসিলা সহিহাহ : ১৫০৩]
আমাদের উচিত আরাফার দিনে এই দু‘আটি বেশি পরিমাণে পাঠ করা।
(৫) আরাফায় আল্লাহ মানুষের কাছ থেকে তাঁর রবুবিয়্যাত তথা প্রভুত্বের স্বীকৃতি নিয়েছিলেন :
ইবনু আব্বাস (রা.) বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ আরাফার ময়দানে আদমের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাঁর সন্তানদের বের করে এই প্রতিশ্রুতি নিয়েছেন, ‘‘আমি কি তোমাদের রব নই?’’, তারা (অর্থাৎ, আমরা) সকল মানুষ সেদিন বলেছিলো, ‘নিশ্চয়ই হ্যাঁ, আমরা সাক্ষ্য দিলাম।’ [সুরা আ’রাফ : ১৭২; মুসনাদে আহমাদ : ২৪৫১; আলবানি, সহিহুল জামি’: ১৭০১]
(৬) আরাফার দিনেই আমাদের দ্বিন তথা ইসলামকে পূর্ণতা দেওয়া হয়েছিলো :
একবার ইহুদিরা উমার (রা.)-কে বললো, তোমরা কুরআনের এমন একটি আয়াত তিলাওয়াত করো, যদি সে আয়াতটি আমাদের মাঝে অবতীর্ণ হতো, তবে, আমরা সেই দিনটিকে ঈদের দিন হিসেবে উদযাপন করতাম। উমার (রা.) বলেন, ‘সেটি কোন্ আয়াত?’ সে বললো, ‘‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বিনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের উপর আমার নিয়ামত পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য ইসলামকে দ্বিন (জীবনবিধান) হিসেবে মনোনীত করলাম (সুরা আল মায়িদাহ, আয়াত: ০৩)।’’ উমার (রা.) বলেন, ‘আমরা জানি কোন্ দিন এবং কোথায় এটি নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াম সাল্লামের উপর অবতীর্ণ হয়েছে। সেদিন তিনি আরাফার ময়াদানে দাঁড়িয়ে ছিলেন এবং সেই দিনটি ছিলো জুমু‘আর দিন।’ [বুখারি, আস-সহিহ : ৪৫]
উল্লেখ্য, এই দিনটিই ছিলো বিদায় হজের দিন।
(৭) এই দিনটিও ঈদের মতই আনন্দের দিন :
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘‘আরাফার দিন, কুরবানির দিন এবং তাশরিকের দিনগুলো (ঈদের পরের তিন দিন) হলো ইসলামে আমাদের ঈদের দিন।’’ [আবু দাউদ, আস-সুনান: ২৪২১; হাদিসটি সহিহ]
(৮) এই দিন (৯ জিলহাজ্জ্ব) এবং এর পরবর্তী আরও ৪ দিনের অন্যতম কাজ হলো, বেশি বেশি তাকবিরে তাশরিক পাঠ করা; এটি ওয়াজিব :
একটি সুন্নাহসম্মত তাকবির :
اَللّٰهُ أَكْبَرْ اَللّٰهُ أَكْبَرْ اَللّٰهُ أَكْبَرْ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللّٰهُ وَاللّٰهُ أَكْبَرْ اَللّٰهُ أَكْبَرْ وَلِلّٰهِ الْحَمْد
আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার; লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার; ওয়া লিল্লাহিল হামদ।
(আল্লাহ সবচেয়ে বড়; আল্লাহ সবচেয়ে বড়; আল্লাহ সবচেয়ে বড়; আল্লাহ ছাড়া কোনও উপাস্য নেই। আল্লাহই সবচেয়ে বড়; আল্লাহই সবচেয়ে বড়; আর আল্লাহর জন্যই সকল প্রশংসা)
এটি ইবনু মাস‘উদ (রা.) ও অন্যান্য পূর্বসূরিদের থেকে প্রমাণিত। [দারা কুতনি, আস-সুনান : ১৭৫৬; আলবানি, ইরওয়াউল গালিল : ৬৫৪; বর্ণনাটির সনদ সহিহ]
আরাফার দিন অর্থাৎ, জিলহজের ৯ তারিখ ফজর থেকে শুরু করে ১৩ তারিখ আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর একাকী বা জামাতে নামাজ আদায়কারী, নারী অথবা পুরুষ—প্রত্যেকের জন্য একবার তাকবিরে তাশরিক (উপরে বর্ণিত তাকবির) পাঠ করা ওয়াজিব। পুরুষদের উচ্চ আওয়াজে বলতে হবে, আর নারীরা নিচু আওয়াজে বলবে, যাতে শুধু নিজে শুনতে পায়। [ইবনু তাইমিয়্যাহ, মাজমু‘উ ফাতাওয়া: ২৪/২২০; ইবনুল কায়্যিম, যাদুল মা‘আদ: ২/৩৬০; ইবনু আবিদিন, রাদ্দুল মুহতার: ৩/৬১; উসমানি, ইলাউস সুনান: ৮/১৫২]
(৯) রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘আল্লাহ তা‘আলার নিকট জিলহজের (প্রথম) দশ দিনের আমলের চেয়ে অধিক মর্যাদাপূর্ণ ও প্রিয় অন্য কোনো আমল নেই।’’ সাহাবিগণ বললেন, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ! আল্লাহ রাস্তায় জিহাদও কি এর চেয়ে উত্তম নয়?’ তিনি বললেন, ‘‘না। আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও নয়। তবে যে ব্যক্তি তার জান ও মাল নিয়ে (জিহাদে) ঝাঁপিয়ে পড়লো এবং এর কোনোটি নিয়েই আর ফিরে এলো না (অর্থাৎ, শহিদ হয়ে গেলো, তার কথা ভিন্ন)।’’ [বুখারি, আস-সহিহ: ৯৬৯; আহমাদ, আল-মুসনাদ: ৬৫০৫; আবু দাউদ, আস-সুনান: ২৪৩৮]
(১০) শয়তানের জন্য এই দিনটি বিষাদময়। সে এই দিনে নিজেকে তুচ্ছ ও অপদস্থ মনে করে এবং রাগান্বিত অবস্থায় থাকে। কারণ এ দিনে আল্লাহ্ মাগফিরাতের ঝর্ণাধারা বইয়ে দেন তাঁর বান্দাদের জন্য। [মুয়াত্তা মালিক]