21/03/2026
Art and science of diagnosis- 2
আমরা প্রায় সময়ই একটা কথা শুনে থাকি “বইয়ের পড়াশুনার সাথে বাস্তবের কোন মিল নেই” কথাটা পুরপুরি মিথ্যা না।
ধরেন একজনের বউয়ের বাচ্চা হওয়ার সময় কোন কারনে সিজার করা লাগলো। সিজার করলো একজন হাতুড়ে ডাক্তার, ডাক্তারের ভুলের কারনে রুগী মারা গেল। তারপর ওই রুগীর বাড়ির লোক পুরো গ্রামে বলতে লাগলো কেউ সিজার করবা না। সিজার করলে রুগী মারা যায়। এখন বলেন তাদের কথা কি মিথ্যা?
তাদের কথা পুরপুরি মিথ্যা না, আবার সত্যি ও না। সিজার করলে রুগী মারা যেতে পারে যদি ডাক্তার অদক্ষ হয়, আবার ডাক্তার অনেক দক্ষ হওয়ার পরও বিভিন্ন জটিলতায় রুগী মারা যেতে পারে যার সম্ভাবনা অনেক কম।
যে সব মানুষ বলে বইয়ের পড়াশুনার সাথে বাস্তবের কোন মিল নেই তাদের কথাও মিথ্যা না। তাদেরকে যদি প্রশ্ন করা হয় “ভাই আমি আপনার কথার সাথে একমত, কিন্তু আপনি কোন বইয়ের সাথে বাস্তব চিকিৎসার মিল খুজে পাননি?” তখন কবি নিরব হয়ে যাবে।
IHT তে মানুষ কি পড়ে পাশ করে? সিনিয়ার আপু বা ভাইয়ারা বিগত ৫-৬ বছরের পরীক্ষার প্রশ্ন যাচাই বাছাই করে ৩০-৪০ টা গুরুত্তপূর্ন্য প্রশ্ন নিয়ে শীট বানায়, সেগুলো পড়ে মুখস্ত করে পরীক্ষা দেয় পরে পরীক্ষা শেষে যাওয়ার সময় সেগুলো জুনিয়ারদের হাতে দিয়ে যায়, জুনিয়াররা তার জুনিয়ারদের হাতে দিয়ে যায়।
এভাবেই তৈরি হয় প্রজন্মের পর প্রজন্ম সার্টিফিকেট ধারি জ্ঞান শূন্য ডেন্টাল টেকনোলজিস্ট যাদের শুধু মুখস্ত কোন দাঁতে কয়টা root এবং কয়টা canal.
এতো অল্প জ্ঞান নিয়ে যখন চিকিৎসার মহাসমুদ্রে নামে তখন বেশিরভাগ জিনিস নতুন পাওয়া যায় এবং যা কিছু মুখস্ত তার সাথেও অনেক জিনিস মিলে না।
একটা সহজ উদাহরন দেই, প্রায় সবাই যে সব চটি বই, গাইড, বড় ভাইদের বা স্যার এর শীট পড়ে আসছে তারা সবাই জানে Mandibular central & lateral incisor দাঁতের Single root, single canal. অথচ ৩০% মানুষের ২টা canal থাকে। যারা সারা জীবন ১টা root ১টা canal জেনে আসছে তারা তো ১টা canal পাওয়ার পর আর খুজেই দেখবে না যে ২য় canal আছে কি না। আবার যদি কখন খুজেও পায় ২টা canal তখন লাফ দিয়ে বলবে এই দেখ বই এর সাথে বাস্তবের সব সময় মিল থাকে না।
তার কথা কি পুরপুরি মিথ্যা? আবার পুরপুরি কি সত্যি? কোনটাই না। সে বইয়ের সাথে মিল পাইনি এটা ঠিক কিন্তু সে বই বলতে যেটাকে বুঝাচ্ছে সেটা যে আসলে বই না সেটা তাকে কে বুঝাবে?
বই পড়ে না শিখলে সব থেকে বড় বিপদ কি বলেন তো? শত শত বছর ধরে সারা পৃথিবীর হাজার হাজার ডেন্টিস্ট লাখ লাখ ভুল করে সেগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে সাবধান করে গেছে বইয়ের মাধ্যমে। এখন আপনিতো ইংরেজি বুঝেন না আর বুঝার চেষ্টাও করেন না। ইংরেজি বই দেখলে আপনার মাথা ঘুরে চোখ অন্ধকার হয়ে আসে। আপনার পক্ষে তো বই পড়ে শেখা সম্ভব না, তাহলে আপনি কিভাবে ভালো চিকিৎসা শিখবেন?
লাখ লাখ ডেন্টিস্ট শত শত বছরের পর বছর গবেষণা করে, ভুল করে সেই ভুল থেকে যে শিক্ষা অর্জন করেছে আপনারও সেইরকম গবেষণা করে লাখ লাখ ভুল করে সেই ভুল থেকে শিক্ষা অর্জন করতে হবে। এই এক জীবনে আপনার পক্ষে কি সেটা সম্ভব?
বুদ্ধিমান মানুষ অন্যের ভুল থেকে শিক্ষা নেয়। পড়াশুনা না করা মানুষের আরেকটা হাতিয়ার হচ্ছে অভিজ্ঞতা। এরা প্রায়ই বলে আমার ১৫ বছর, ২০ বছরের অভিজ্ঞতা। কথাটা কি পুরপুরি ভুল?
নাহ, আবার কথাটা পুরপুরি ঠিকও না। আপনি যদি প্রতিনিয়ত পড়াশুনা করেন, নতুন নতুন জিনিস শিখেন তাহলে আপনার ২০ বছরের অভিজ্ঞতা কথাটা পুরপুরি ঠিক। কিন্তু আপনি যদি প্রথম ১ বছর যে পড়াশুনা করছেন যা কিছু শিখছেন সেগুলো দিয়েই ২০ বছর ধরে চিকিৎসা করে যান তাহলে আপনার আসলে ২০ বছরে অভিজ্ঞতা না, আপনার ১ বছরের অভিজ্ঞতার ২০ বার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে।
এখন প্রশ্ম হচ্ছে আমি Diagnosis এর ভিতর এসব নিয়ে এতো আলোচনা শুরু করলাম কেন? চলেন বিষয়টা একটু বুঝার চেষ্টা করি।
Endodontics এ সারা পৃথিবীতে সব থেকে গ্রহনযোগ্য বই হচ্ছে “Cohen’s Pathways of the Pulp”। এই বইয়ের প্রথম অধ্যায় হচ্ছে Art and science of diagnosis. আপনারা কিছু না হলেও এই বইটার অন্তত PDF ওপেন করে দেইখেন মোবাইলে। PDF খুজে না পেলে আমার সাথে যোগাযোগ কইরেন।
যাইহোক এতো গুরুত্বপূর্ণ বইয়ে Diagnosis এর সাথে Art and science লাগালো কেন? শুধু Diagnosis বললেই তো হতো। এখানেই হচ্ছে মূল ঘটনা, Diagnosis করতে গেলে ২টি জিনিস লাগে Art এবং Science. একটাকে বাদ দিয়ে অন্যটাকে দিয়ে রোগ নির্নয় করা সম্ভব না। চলেন এটা নিয়ে আমরা একটু বিস্তারিত আলোচনা করি।
ধরেন আপনার কাছে একটা রোগী আসলো দাঁতে ব্যথা নিয়ে। আপনি যদি ঐ দাঁতে ব্যথার কারন ব্যখ্যা করতে পারেন বই এর ভাষায় এটাকে বলে Diagnosis এর Science. দাঁতে ব্যথা নিয়ে আসলে আপনি যদি কারন ব্যখ্যা করতে না পারেন আর মনে করেন এতো কিছু বুঝে কি হবে RCT করে দিলেই ব্যথা কমে যাবে, আপনি তখই বিপদে পরবেন।
আমার এরকম অনেক ভাইয়ের সাথে কথা হয় যারা রোগীর RCT করার পরও ব্যথা কমছে না। তখন তাদের জিজ্ঞাসা করা হলে যে কেন ঐ দাঁতে RCT করলেন। তারা বলে ব্যথা ছিল তাই RCT করছি, তখন জিজ্ঞাসা করি কেন ঐ দাঁতে ব্যথা হচ্ছিলো? তারা বলে “তা তো জানি না”। আমি যখন বলি আপনি যদি না বুঝেন কেন ব্যথা হচ্ছে তাহলে RCT করলেন কেন? তখন আর কোন কথা বলে না।
আমি বর্তমানে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের আব্দুল্লাপুরে চাকরি করি। আমার চেম্বারের মালিকের চেম্বার পাশের গ্রামে। তার চেম্বারে ২টা ইউনিট, তার কাছে ৩ বছর ধরে একটা ছেলে থাকে তাকে সে সব কাজ শেখাইছে। আমার চেম্বারের মালিক প্রায়ই আমার কাছে ঐ ছেলের প্রশংসা করে যে সব কাজ পারে বুঝে এবং তাকে দিয়েই প্রায় সব কাজ করায়। আমার কাছে একবার একটা রোগী আসে দাঁতে ভিতর ফাইল ভাঙ্গা। পরে আমি রোগীকে ঢাকা এক স্যারের কাছে পাঠালাম, স্যার microscope ব্যাবহার করে এবং আমার রোগীর কাজটা সুন্দর ভাবে করে দিছে। এটা নিয়ে আমি মালিকের সাথে আলোচনা করছিলাম তখন সেই ছেলে এটা শুনে বললো সে কয়েক বার দেখলে আর চেষ্টা করলে সেও পারবে। শুনে আমার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। বুঝেন ঐ ছেলের কনফিডেন্স কোন লেভেলে চলে গেছে।
সেই ছেলে আমাকে প্রয়ই বলে বইয়ের ভিতরেই যে সব কিছু আছে এরকম না, বইয়ের বাইরেও অনেক কিছু আছে। আমার মনে মনে প্রশ্ম করতে ইচ্ছা করে যে তুমি তো বই পড়নি তাহলে তুমি বুঝলে কি করে যে বইয়ের ভিতরে কি আছে আর কি নেই? কিন্তু আমি প্রশ্ম না করে চুপ থাকি কারন মূর্খের সাথে তর্কে যাওয়া ও মূর্খের পরিচয়।
আমার চেম্বারে দাঁতের ব্যথ্যা নিয়ে একজন গ্রাম পুলিশ ৪-৫ বার আসছিল। আমি প্রতিবার তাকে বুঝিয়ে বলেছি দেখেন আপনার দাঁতে কোন সমস্যা নেই, অন্যকোন জায়গায় সমস্যা আপনি একজন ব্রেনের ডাক্তার দেখান। গ্রামের রোগীতো শহরে গিয়ে ডাক্তার দেখানো কঠিন, সে আর শহরে যায়নি। আমি একবার ছুটিতে বাড়ি গেছি তখন আমার চেম্বারে ঐ ছেলেটা মাঝে মাঝে এসে বসতো। তো কিভাবে কিভাবে ঠিক ঐ সময় সেই গ্রাম পুলিশ আসছে ব্যথা নিয়ে। ঐ ছেলে গ্রাম পুলিশের দাঁতে RCT শুরু করে দিছে, প্রথম দিন একদম ফাইনাল প্রিপারেশন করে ছেড়ে দিছে কিন্তু ব্যথা তো কমে না। পরে রোগী ঢাকায় গেছে বড় ডাক্তার দেখাইছে পরে ধরা পড়ছে তার মাইগ্রেনের সমস্যা। বিনা কারনে তার দাঁত নষ্ট করা হইছে। রোগীতো ঢাকা থাকা অবস্থায় ফোন দিয়ে হুমকি ধামকি দিয়ে অবস্থা খারাপ। চেম্বারের মালিকের ও ভয়ে অবস্থা খারাপ পরে সে আসলে চিকিৎসার টাকা ফেরত দিয়ে মিটমাট করা হইছে।
ঐ গ্রাম পুলিশ এর পর থেকে যতো বার আমার সাথে দেখা হয় মাথা নিচু করে বলে আপনার কথা না শুনে আমার এতো বড় ক্ষতি হইছে। আপনি যা বলছিলেন তাই হইছে, মাইগ্রেনের ঔষুধ খেয়ে আমি এখন পুরো সুস্থ। এরপর থেকে সে আমার কাছে অনেক রোগী পাঠায়।
অল্প বিদ্যা ভয়ংকর, এটার প্রমান আপনি ঠিকই একদিন না একদিন হাতে কলমে পাবেন, হয়তো একটু অপেক্ষা করা লাগতে পারে।
আমরা যখন শহরে বড় ডাক্তারের কাছে যাই। ডাক্তার আমাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনে ২-৩ টা প্রশ্ম করে কিছু ঔষুধ লিখে দেয়। এখন কেউ যদি ডাক্তারের প্রশ্ম এবং ঔষুধ এর নাম মুখস্ত করে গ্রামে এসে চিকিৎসা শুরু করে তাহলে কি তার চিকিৎসায় কাজ হবে? হবে না কারন বড় ডাক্তার সব ধরনের রোগ সম্পর্কে গভীর ভাবে জানে। রোগীর সমস্যা শুনে সে মনে মনে একটা রোগ সম্পর্কে ধারনা করে এটাকে বলে Provisional Diagnosis পরে ২-১ টা প্রশ্ম করে করে সে কয়েকটা সম্ভাব্য রোগের লিস্ট করে এটাকে বলে Differential Diagnosis পরে সে পরিক্ষা নিরিক্ষা করে শিওর হয় কোন রোগ হইছে এটাকে বলে Confirmatory Diagnosis তার পরে সে সেই রোগের ঔষুধ দেয়।
কোন জায়গায় কোন প্রশ্ম বা পরিক্ষা করতে হবে এটাকেই বলে Diagnosis এর Art.
আমার কাছে একবার একটা রোগী আসছিল প্রচন্ড ব্যথা নিয়ে রাতে ঘুমাতে পারে নাই এমন ব্যথা। সব লক্ষন শুনে বুঝা যায় irreversible pulpitis এর ব্যথা। কিন্তু রোগী যে দাঁত দেখায় সেটায় irreversible pulpitis এর কোন লক্ষন দেখা যায় না। পরে আমি দেখলাম তার নিচের মাড়ির একটা আক্কেল দাঁত নষ্ট। পরে তাকে অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে ঐ দাঁতটা ফেলে দেওয়ার পরে সে পুরপুরি সুস্থ। এখন অবস্থা এমন হইছে তার পেটে ব্যথা হলেও সে আমাকে দেখাবে। আমি তাকে বুঝাতে পারি না যে পেটের চিকিৎসা করা আমার পক্ষে সম্ভব না।
ডেন্টালে রোগীর লক্ষনের সাথে দাঁতের অবস্থা মিলাতে পারাকে Diagnosis এর Art বলে।
এজন্য একটা সঠিক Diagnosis করতে গেলে আপনার Science ও জানা লাগবে আর Art ও থাকা লাগবে।
আমাদের সাথে অনেক মেধাবি মেয়ে পড়তো যারা ভাল পড়াশুনা করতো, পরিক্ষায় ও ভালো করতো যদিও পরিক্ষায় সর্বোচ্চ মার্ক আমি পেতাম কিন্তু তারা আমার কাছাকাছি থাকতো কিন্তু বর্তমানে তাদের ভিতর সবাই ভালো অবস্থানে নেই। কিন্তু কেন?
৯৯% মেয়েরা কোন কিছু না বুঝেই সবকিছু মুখস্থ করে পরিক্ষায় ভালো নম্বর পায়। এজন্য যখন তারা পড়াশুনা শেষ করে কর্মক্ষেত্রে যায় তখন সব কিছু মাথার ওপর দিয়ে যায়। আমি যদি irreversible pulpitis এর সবকিছু মুখস্থ করে বসে থাকতাম তখন রোগীর লক্ষন শুনে দাঁত দেখে আমি শিওর হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারতাম না।
এজন্য পড়াশুনা না করলে তো ধরা খাবেন, না বুঝে মুখস্থ করলে অবশ্যই ধরা খাবেন।
F. Rifat Hasan
IHT, Barishal
Department of Dentistry
Session: 2018-19