08/03/2025
🦷 দাঁতের চিকিৎসার খরচ বিষয়ে সর্বাধিক শোনা দুটি প্রশ্ন হলো-
➡️ দাঁতের চিকিৎসায় খরচ এতো বেশী কেনো?
➡️ বিভিন্ন প্রাইভেট ডেন্টাল চেম্বারে খরচের ভিন্নতা কেনো ❓❓
সাধারন মানুষকে খুব সহজে বোঝানোর জন্যে আজ প্রশ্ন দুটির উত্তর দিচ্ছি, ধৈর্য্য ধরে পুরো লেখাটা পড়বার অনুরোধ রইলো।
🦷 🥼 🩺 চিকিৎসকের শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং অভিজ্ঞতাঃ
পূর্বে চার বছর এবং বর্তমানে পাঁচ বছর পড়াশোনা করে বিডিএস ডিগ্রী অর্জনের পর ইন্টার্ন শেষ করে একজন ডাক্তার প্র্যাকটিস শুরু করেন। নিজে ব্যাক্তিগত চেম্বার দিতে যাবার আগে অতিরিক্ত অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্যে শিক্ষক অথবা সিনিয়রদের চেম্বারে বিনা পারিশ্রমিকে অথবা নামমাত্র পারিশ্রমিকে একটা লম্বা সময় কাজ শিখতে হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন ডেন্টাল কলেজে অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ,বিভিন্ন সভা-সেমিনারে অংশগ্রহণ,দেশে-বিদেশে হ্যান্ডস অন কোর্স করে নিজেকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হয়। এটা হলো নূন্যতম; অনেকে নিজেকে স্পেসিফিক কোনো বিষয়ে আরো দক্ষ করতে কয়েক বছর অক্লান্ত পড়াশোনা+ট্রেনিং করে সে বিষয়ে এফসিপিএস, এমএস, ডিডিএস, পিএইচডি ইত্যাদি পোস্ট-গ্রাজুয়েশন করে থাকেন, দীর্ঘ সাধনার পর দাঁতের বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলেন।
অধিকাংশ রোগীর নিকট দাঁতের চিকিৎসকের পরামর্শ ফি অষ্টম আশ্চর্যের মতো বিষয়। MBBS ডাক্তার পাঁচ মিনিট সময় দিয়ে পাঁচশ-হাজার টাকা পরামর্শ ফি নিলে সমস্যা নেই, BDS ডাক্তার ডেন্টাল চেয়ারে নিয়ে রোগীকে পরীক্ষা করে তারপরে সে অনুযায়ী চিকিৎসা পদ্ধতি বুঝিয়ে পরামর্শ ফি তিনশ-পাঁচশ টাকা চাইলে অনেক রোগীই অবাক হন। "কোন চিকিৎসা তো নিই নাই, শুধু কথা বলার জন্য কেন টাকা দিতে হবে?" এমনটা মনে করেন অনেকেই।
🦷 চেম্বার লোকেশন, ভাড়া, ডেকোরেশনঃ
ডেন্টাল চেম্বার দিতে গেলে বেশ বড় স্পেস নিতে হয়, চেম্বারের এডভান্স এবং ডেকোরেশনে শুরুতেই বড় একটা ব্যয় হয়। বড় স্পেসের জন্য প্রতিমাসে একটা ভাড়া বহন করতে হয়।
🦷 ডেন্টাল এসিসটেন্ট, রিসিপশনিস্ট, ক্লিনারের বেতনঃ
চেম্বারে প্রয়োজন অনুযায়ী জুনিয়র ডেন্টিস্ট, ডেন্টাল এসিসট্যান্ট, রিসিপশনিস্ট এবং ক্লিনার রাখতে হয়, মাস শেষে তাদের বেতন চেম্বার মালিক ডাক্তারকেই দিতে হবে।
🦷 বড় অংকের ব্যক্তিগত ইনভেস্টমেন্টঃ
ডেন্টাল চেম্বারের জন্যে ডেন্টাল চেয়ার, কম্প্রেসর, এক্স-রে, আরভিজি, স্কেলার, অটোক্লেভ, আইপিএস, জেনারেটর, এসি থেকে শুরু করে প্রচুর দামি যন্ত্রপাতি কিনতে হয়। এগুলো শুধু দামীই নয়, মেইন্টেইনেন্স খরচও আছে; এবং সবকিছুই নির্দিষ্ট মেয়াদ পার হলে নষ্ট হতে শুরু করে। তাছাড়া ডেন্টালে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি, ম্যাটেরিয়ালস প্রায় সবই বিদেশ থেকে ইম্পোর্ট করে আনা; তাই এসব কিনতে খরচ অনেক বেশী পড়ে। কেউ আট-দশ লাখ টাকা দামের জাপানিজ-কোরিয়ান ব্র্যান্ডের চেয়ার ব্যাবহার করেন, কেউ দেড়-দুই লাখ টাকার চাইনিজ চেয়ার ব্যবহার করেন। কেউ দশ-পনেরো হাজার টাকার এন্ডোমটর ব্যবহার করেন রুট ক্যানেল ট্রিটমেন্ট করতে, কেউ চল্লিশ-পঞ্চাশ হাজার টাকার এন্ডোমটর ব্যবহার করেন। কারো লাইট কিউর মেশিনের দাম পাঁচ হাজার টাকা, কেউ ত্রিশ-চল্লিশ হাজার টাকার লাইট কিউর মেশিন ব্যবহার করেন। কোনো জিনিসই আজীবনের জন্যে না, কয়েক বছর পার হলে নতুন কিনতে হয়; তাছাড়া ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়ার দারুণ দিন দিন এসব ব্যয় বেড়েই চলেছে। চিকিৎসকের ইনভেস্টমেন্ট অনুযায়ী চিকিৎসা খরচ কম-বেশী হয়।
🦷 জটিল, সূক্ষ এবং সময়সাপেক্ষ চিকিৎসাঃ
ডেন্টালের অধিকাংশ চিকিৎসাই সূক্ষ, তাই নিখুঁতভাবে কাজ করতে হয়। ধৈর্য ধরে মনোযোগ সহকারে দীর্ঘসময় ধরে কাজ করতে হয়। উদাহরণ স্বরুপ এক রুট ক্যানেল চিকিৎসা শেষ করতে ক্ষেত্রবিশেষে তিন-চার দিন সময় লাগে এবং প্রতি ভিজিটে নূন্যতম আধঘন্টা সময় লাগে। একই সময় ব্যয় করে একজন MBBS ডাক্তার বেশ কয়েকটি অপারেশন সম্পন্ন করতে পারেন এবং বিনিময়ে অনেক বেশী অর্থ উপার্জন করেন। কিন্তু এত দীর্ঘ সময় ব্যয় করে দামী ম্যাটেরিয়ালস খরচ করে,দামী ইন্সট্রুমেন্ট ব্যাবহার করে যদি রুট ক্যানেলের যৌক্তিক খরচ চাওয়া হয়; তাহলে অধিকাংশ রোগীই অবাক হন।
বাজারে গেলে কেউ গত বছরে জিনিসপত্রের দামের কথা উল্লেখ করে এখন কম রাখতে অনুরোধ না করলেও ডেন্টাল চেম্বারে এসে পেশেন্টরা পাঁচ-দশ বছর পূর্বের চিকিৎসা খরচ উল্লেখ করে বর্তমানে কম রাখতে অনুরোধ করেন; এসবের জন্যে ডেন্টিস্টদের প্রায়শই বিব্রত হতে হয়।
🦷 রোগীর দাঁতের যত্নের প্রতি অসচেতনতা এবং অবহেলাঃ
দাঁতের চিকিৎসার খরচ বেশী হবার পেছনে রোগীরাও অনেকাংশে দায়ী। অধিকাংশ রোগী সমস্যার শুরুতেই চিকিৎসা না করিয়ে প্রথমে ব্যাথার ঔষধ এবং পরবর্তীতে এর ওর পরামর্শে এন্টিবায়োটিক খেয়ে পরে সমস্যা জটিল রুপ ধারন করলে তখন চিকিৎসকের শরনাপন্ন হন। প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসা করালে খরচ কমে যায়। তাই ছয় মাস অন্তর অন্তর নিয়মিত ডেন্টাল চেকআপ করাতে হবে।
🦷 দাঁতের চিকিৎসায় এককালীন ব্যবহৃত জিনিসঃ
হ্যান্ড গ্লভস, সাকশন টিপস, রাবার ড্যাম এককালীন ব্যবহার করা হয়। অন্যান্য যন্ত্রপাতি যেগুলো সরাসরি মুখগহ্বরের সংস্পর্শে আসে সেগুলো একজন ব্যবহার করার পর সরাসরি অন্যের মুখে ব্যবহার করা যায় না, এ জন্য অটোক্লেভ, ক্যামিক্যাল দিয়ে জীবানুমুক্ত করা হয় যা সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল।
🦷 ল্যাবরেটরি বিলঃ
ডেন্টাল ক্রাউন বা ক্যাপ, ব্রিজ, ডেনচার (আলগা দাঁত) থেকে শুরু করে অনেক কিছুই ডেন্টাল ল্যাবে তৈরী করা হয়। এসব তৈরির জন্য নিয়মিত একটা বড় অংশ ল্যাবে দিতে হয়।
🦷 ইলেকট্রিসিটি বিলঃ
ডেন্টাল চেম্বার ইলেক্ট্রিসিটি বাদে প্রায় সম্পূর্ন অচল। তাই খরচের একটা ভালো অংশ এ খাতে ব্যায় হয়। চেম্বারের লাইট, ফ্যান, ডেন্টাল চেয়ার, কম্প্রেসর, এক্স-রে, এসি, সাইনবোর্ড, টিভি, ইন্ট্রা ওরাল ক্যামেরা, আইপিএস, সাকশন মেশিন, লাইট কিউর মেশিন, মাইক্রোমটর, এন্ডোমটর, এক্স-রে, আরভিজি, কম্পিউটার, অটোক্লেভ, আলট্রা ভায়োলেট স্টোরেজ সব কিছুতে বিদ্যুতের প্রয়োজন। প্রতি মাসে অনেক বিল দেওয়া লাগে এই বিদ্যুতের জন্য।
এত কিছুর পরেও উন্নত বিশ্বের তুলনায় বাংলাদেশের দাঁতের চিকিৎসার খরচ অনেক কম। যাদের আত্মীয়স্বজন বাইরের দেশে থাকেন, তারা অবশ্যই জানেন; আর ইন্টারনেটের কল্যাণে গুগল-ইউটিউব ঘাঁটলেই বিষয়টির সত্যতা যাচাই করতে পারবেন। অনেক প্রবাসী শুধুমাত্র দাঁতের চিকিৎসা করাতে এদেশে আসেন।
সর্বশেষে বলি প্রত্যেক চিকিৎসকই তার পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজন, পরিচিত মানুষজন, কাছের মানুষজন থেকে শুরু করে গরীব-অসহায় মানুষদের নামেমাত্র মূল্যে চিকিৎসা করে থাকেন এবং সে সংখ্যা খুব একটা কম না। তাই বলে সবাই যদি নামমাত্র মূল্যে চিকিৎসা করাকে নিজের অধিকার ভাবেন, আর্থিক সক্ষমতা থাকার পরেও ডিসকাউন্ট প্রত্যাশা করেন তাহলে এ পেশায় টিকে থাকাটা চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়ায়।
ধন্যবাদ
© Dr. Rifat E Waliullah