20/09/2022
দাঁতে গর্ত হলে করনিয় কি?
ফিলিং,রুট ক্যানেল, না অন্য কোন ব্যাবস্থা আছে?
দাঁতের ক্ষয়, গর্ত বা ব্যাথা নিয়ে চিকিৎসা নিতে এলে রোগীরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আক্রান্ত দাঁত রক্ষায় দুটি চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে পারেন। একটি ফিলিং, অন্যটি RCT বা রুট ক্যানেল চিকিৎসা। যেহেতু ফিলিংয়ের চেয়ে রুট ক্যানেল চিকিৎসা পদ্ধতি জটিল, সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল, তাই অনেকেই জানতে চান দাঁতের গর্তে ফিলিং না করে কেন রুট ক্যানেল করতে হবে। এমন যুক্তিসংগত প্রশ্নের উত্তর শুধু রোগীদের নয়, সাধারণ মানুষেরও জানা জরুরি।
ফিলিং কখন করতে হয়?
দাঁতের ক্ষয় যখন প্রথম স্তর অর্থাৎ এনামেলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তখন ফিলিংয়ের মাধ্যমেই দাঁতকে স্বাভাবিক রাখা যায়। এনামেল ক্ষয় হওয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে দাঁতে তেমন কোনো অস্বাভাবিকতা অনুভব হয় না। এ অবস্থায় একজন অনুমোদিত ডেন্টাল টেকনোলজিস্ট অথবা ডেন্টাল সার্জন দাঁত ক্ষয়ের গভীরতা বুঝে খুব অল্প সময়ের মধ্যে দাঁতের রঙের সঙ্গে রং মিলিয়ে ফিলিং পদার্থ দিয়ে দাঁতের গর্ত পূরণ করে সহজেই দাঁতকে সুস্থ করে তোলে। ফিলিংয়ের রং ও আকৃতি এতটাই নিখুঁত হয়, দাঁতে ফিলিংয়ের উপস্থিতি অনুভব করা যায় না। তাই শুরুতেই দাঁতের চিকিৎসা নেয়া উত্তম।
RCT বা রুট ক্যানেল (Root Canal Treatment)
কখন করতে হয়?
আমাদের অবহেলা বা উদাসীনতার কারণে দাঁতের গর্তের গভীরতা যখন মধ্যকার মজ্জা বা পাল্পে চলে যায়, এবং পাল্প খুব বাজে ভাবে ড্যামেজ করে ফেলে তখন দাঁত রক্ষার এই একটি পদ্ধতি রয়েছে। তবে অভিজ্ঞতা থেকে বলছি এমনো দেখা যায় পাল্প ইনফেক্টেড হয় নি, শুধুমাত্র পাল্প চেম্বার ওপেন হয়েছে অর্থাৎ ছিদ্রটি বা গর্তটি কেবলমাত্র দাঁতের এনামেল এবং ডেন্টিন পার করে পাল্পে পৌছেছে তখনো রুট ক্যানেল না করে পাল্প ক্যাপিং করা যায় এবং দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে বলছি তার রেজাল্ট রুট ক্যানেল থেকে ভালো। প্রায়শই গর্তের শুরুতে আমরা চিকিৎসা নিতে যাই না, যতক্ষণ না ব্যাথা অনুভব হয়।
মজ্জা খুব সংবেদনশীল। কারণ দাঁতের স্তরের মধ্যে
শুধু এখানেই প্রচুর স্নায়ু ও রক্তের সঞ্চালন রয়েছে।
এই ব্যথা নিয়েও অনেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ফার্মেসি থেকে ওষুধ নিয়ে ব্যাথা কমিয়ে রাখেন,
যা পরে সঠিক চিকিৎসা ব্যবস্থাকে জটিল করতে পারে। ফলে এমনও দেখা যায় রুট ক্যানেল করেও দাঁতটি অনেকক্ষেত্রে টিকিয়ে রাখা যায় না। তাই আবারো অনুরোধ করছি, শুরুতেই ব্যবস্থা নিন।
রুট ক্যানেল নিয়ে কিছু প্রচলিত ভুল ধারনাঃ
রুট ক্যানেল চিকিৎসা নিয়ে আমাদের অনেকের নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে। এটা হতে পারে রোগীর নিজের বা পরিচিত কারোর পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে। যেমন- কেউ হয়তো চিকিৎসাটা যথানিয়মে শেষ না করে বা অপচিকিৎসার শিকার হয় চিকিৎসাটি সফল না হওয়া থেকে। অসফল রুট ক্যানেল প্রায়ই বিভিন্ন রকম সমস্যা দেখা দেয়, তার মাঝে সবচেয়ে বেশী দেখা যায় খাবার চিবালে ব্যাথা লাগা। রুট ক্যানেল করা দাঁতের গোড়ায় পুঁজ হওয়া বা ফুলে যাওয়া,
ক্যানেল ইনফেকশন হওয়া।
রুট ক্যানেলের প্রকারভেদঃ
সাধারণত রুটক্যনেল দুই প্রকারঃ
১. ম্যানুয়াল রুট ক্যানেলঃ
নামেই বোঝা যাচ্ছে এটা ম্যানুয়ালি করা হয়।
শুধুমাত্র এক্সরের উপর নির্ভর করে ম্যানুয়াল রুট ক্যানেল করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় এক্সরে থেকে ক্যানেল লেন্থ মেপে নিয়ে সেই অনুযায়ী রুট ক্যানেল করা হয়। সাধারনত এ প্রক্রিয়ায় বাকা ক্যানেল হলে এপিক্যাল পার্ফোরেশন হওয়ার পসিবিলিটি বেশী থাকে। যেহেতু হাতের সাহায্যে পরিস্কার করা হয় তাই বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই পাল্প চেম্বার, পাল্প ক্যাভিটি ঠিকমতো ক্লিন করা সম্ভব হয় না। যার ফলে অল্প কিছুদিনেই ইনফেকশন দেখা দেয়। আপনারা যাদের কাছে নেতিবাচক মন্তব্য শুনবেন তাদের প্রায় সকলকেই জিজ্ঞেস করলে পাবেন রুট ক্যানেল মানে হাতে খুচিয়ে খুচিয়ে ময়লা পরিস্কার করা, কেউ আবার বলবে চিকন সুই দিয়ে খুচিয়ে ময়লা পরিস্কার করে দেয়, আবার কেউ বলবে দাঁতের রগ বের করে দেয়। আসলে উনারা সকলেই ম্যানুয়াল রুট ক্যানেল করেছিলেন যেখানে ডেন্টাল ড্রিল দিয়ে ছিদ্র করে ব্রোচ, ফাইল, রিমার দিয়ে হাতে খুঁচিয়ে ক্যানেল পরিস্কার করা হয়েছে। তাছাড়াও এটি একটি দীর্ঘ মেয়াদী চিকিৎসা। দাঁতের উপর ভিত্তি করে ১০-৩০ দিন পর্যন্ত সময় লেগে থাকে। দুঃখ জনক হলেও সত্য আমাদের দেশে এখনো ৯৯% ক্লিনিকে ম্যানুয়াল রুট ক্যানেল করা হয়, হাসপাতাল গুলোর কথা না হয় বাদই দিলাম।
২. মাইক্রোস্কোপিক রুট ক্যানেলঃ
এ প্রক্রিয়ার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যাবহার। শুরুটা হয় পেইনলেস ইনজেকশন টেকনোলজি দিয়ে, তারপর ম্যানুয়াল রুট ক্যানেলের মতোই এক্সরে দেখে ডেন্টাল ড্রিলের সাহায্যে পাল্প চেম্বার ওপেন করা হয়, এবং রিমার,ফাইল, ব্রোচ দিয়ে ক্যানেল ডিটেকশন এবং প্রাইমারি ক্লিনিং করা হয়।
মাইক্রোস্কোপিক ক্যামেরার সাহায্যে ক্যানেল
পজিশন চেক করে নেয়া হয়। এবার এপেক্স লোকেটর এর সাহায্যে নিখুঁত ও নির্ভূল ভাবে প্রতিটা ক্যানেলের আলাদা আলাদা লেন্থ বের করা হয় যা রাডারে পরিস্কার দেখা যায় অতঃপর এন্ডোরাডার ও কন্ট্রাএজ্ঞেলের সাহায্যে দাঁতের রুট পার্টে অবস্থিত ক্যানেল ক্লিনিং ফাইলিং করা হয় যা সেকেন্ডে কয়েক হাজার বার মুভ করে ফলে অল্প সময়েই ক্যানেল পুরোপুরি পরিস্কার হয়ে যায়। এরপর এন্ডো ইরিগেটর স্প্রের সাহায্যে ডিপ ক্লিনিং করা হয়।
তারপরেও আল্ট্রাসনিক এন্ডোক্লিনিং মেশিনের
সাহায্যে ভালোমতো পরিস্কার করা হয়। আবার ইরিগেটর ব্যাবহার করে পরিস্কার করা হয়। এরপর পেপার পয়েন্ট দিয়ে ড্রাই করে রুট ক্যানেল ফিলার এন্ড সিলার দিয়ে অবটুরেশন পেনের সাহায্যে হিট দিয়ে সিল করে দেয়া হয়। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে পাল্প ডিভাইটালাইজিং এজেন্ট বা এ ধরনের অন্য কিছু ব্যাবহারের প্রয়োজন হলে ৩-৪ দিন পর রুট ক্যানেল সিল করা যেতে পারে।
ম্যানুয়াল বা হাতে করা রুট ক্যানেলের সাক্সেস রেট যেখানে ৬৭% সেখানে মাইক্রোস্কোপিক রুট ক্যানেলের সাক্সেস রেট ৯৮% !
আমাদের দেশে এখন রুট ক্যানেল চিকিৎসা উন্নত বিশ্বের মতো। সঠিক স্থান থেকে চিকিৎসা পেলে এর সফলতা ৯৮ ভাগের বেশি। সুতরাং, এই চিকিৎসা নিয়ে সংশয়ের কোনো সুযোগ নেই। রুট ক্যানেল শেষে দাঁতটির ওপর কৃত্রিম মুকুট বা ক্যাপ করে নেওয়া জরুরি। কারণ এই চিকিৎসা শেষে দাঁতের ইলাস্টিসিটি কমে যাওয়াতে ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তবে ক্যাপ ছাড়াও শুধু ফিলিং দিয়ে কিছুটা সময় পার করা যায়, এ সম্পর্কে আপনার ডেন্টিস্ট কে জিজ্ঞেস করুন। উনি দাঁতের অবস্থা বুঝে আপনাকে একটা সময় দিয়ে দিবেন। তবে সম্ভব হলে সাথে সাথেই ক্যাপ করানো উত্তম।
সুতরাং দাঁতের গর্তে বা ব্যাথায় দাঁতকে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে রক্ষা করতে হবে। সংখ্যাতে বেশি হলেও প্রতিটি দাঁতের আলাদা প্রয়োজনীয়তা আছে। সারা বিশ্ব বলে ছয় মাস অন্তর অন্তর ডেন্টাল চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে মুখের যেকোনো রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা যায়। তখন তার চিকিৎসা পদ্ধতিও সহজ হয়। মুখ আমাদের শরীরের প্রবেশদ্বার, তাকে সঠিক নিয়মে নিয়মিত যত্নের কোনো বিকল্প নেই। দুইবেলা দাঁত ব্রাশ করুন, ছয়মাস পরপর স্কেলিং ও ডেন্টাল চেকাপ করুন। দাঁত ও মুখের ৯০% সমস্যা হয়ে থাকে স্কেলিং (চিকিৎসক দিয়ে দাঁত পরিস্কার) না করানোর কারনে!
Alo dental care