27/08/2026
চার বছর মেয়াদী ডেন্টাল ডিপ্লোমাধারীদের বিএমডিসি নিবন্ধন ও প্রাইমারি ডেন্টাল প্র্যাকটিসের আইনি অধিকার প্রসঙ্গ-
👉এম. মিজানুর রহমান
চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্যবিদ ও মেডিকোলিগ্যাল লইয়ার
দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দন্ত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিতকরণ এবং ডেন্টাল ডিপ্লোমাধারীদের (ডেন্টাল টেকনোলজিস্ট) পেশাগত মর্যাদা ও আইনি অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে বর্তমান প্রেক্ষাপট ও আইনি দিকগুলো অত্যন্ত জোরালোভাবে সামনে এসেছে।
প্রধান বিষয়সমূহ এক নজরে:
জনসংখ্যার তুলনায় চিকিৎসকের স্বল্পতা: দেশের ১৮ কোটি মানুষের দন্ত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার জন্য বিদ্যমান মাত্র ১৪ হাজার বিডিএস (BDS) চিকিৎসক পর্যাপ্ত নন।
কোয়াক বা ভুঁইফোড় চিকিৎসকদের দৌরাত্ম্য: দেশের আনাচে-কানাচে এবং অলিতে-গলিতে প্রায় লক্ষাধিক ভুঁইফোড় ডেন্টাল কোয়াক (যাদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সনদ নেই) চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছেন।
ডিপ্লোমাধারীদের অন্তর্ভুক্তি ও সুফল: প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রাথমিক দন্ত চিকিৎসার জন্য প্রায় ২০ হাজার ডেন্টাল ডিপ্লোমাধারীকে (ডেন্টাল টেকনোলজিস্ট) বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (BMDC) নিবন্ধনের আওতায় আনা হলে প্রান্তিক পর্যায়ে কোয়াক প্র্যাকটিস উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
আইনি বিশ্লেষণ ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (BMDC) আইন ২০১০-এর ধারা ২(৪), (১৫), ধারা ৫(১), (১২), (২৩), ধারা ১৪(১), (২), (৪), ধারা ১৬, ধারা ৩৫(১)খ এবং চতুর্থ তফসিল অনুযায়ী—বাংলাদেশ স্টেট মেডিকেল ফ্যাকাল্টি ডেন্টাল চিকিৎসা-শিক্ষা যোগ্যতার ডিপ্লোমাধারীদের নিবন্ধনের সুযোগ রয়েছে। তা সত্ত্বেও বিএমডিসি কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন ধরে ডেন্টাল ডিপ্লোমাধারীদের নিবন্ধন প্রদানে গড়িমসি করে আসছে, যা সংসদ কর্তৃক প্রণীত আইনের পরিপন্থী ও সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক।
ঐতিহাসিক ও আইনগত ধারাবাহিকতা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়:
The Dentist Act, 1948 (ভারত): উপমহাদেশের সকল ডেন্টাল লাইসেন্সশিয়েট ও ডিপ্লোমাধারীদের নিবন্ধনের সুযোগ ছিল।
Pakistan Medical and Dental Council (PMDC) Ordinance, 1962: এর ধারা ১৮ অনুযায়ী দন্ত চিকিৎসায় ডিপ্লোমা/লাইসেন্স/সার্টিফিকেটধারীদের পেশাগত নিবন্ধনের সুযোগ ছিল।
Bangladesh Medical and Dental Council Act, 1973: এর ধারা ১৬ (১), (২), (৩) অনুযায়ী ডিপ্লোমাধারীদের নিবন্ধনের সুযোগ রাখা হয়েছিল।
Bangladesh Medical and Dental Council Act, 1980: এর ধারা ১৫ (১), (২)-এর বিধান অনুযায়ী পঞ্চম তফসিলে দন্ত চিকিৎসা-শিক্ষা যোগ্যতার ডিপ্লোমাধারীদের নিবন্ধনের সুযোগ ছিল।
দুঃখজনক হলেও সত্য, পূর্বের আইনগুলোতে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ডিপ্লোমাধারীদের নিবন্ধন দেওয়া হয়নি। তবে ১৯৮০ সালের আইনের ১৫(৩) ধারায় প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি বা ডিপ্লোমা ছাড়া প্রায় ৫ হাজার ব্যক্তিকে নিজস্ব চেম্বারে ৫ বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে "অনুমোদিত দন্ত চিকিৎসক" হিসেবে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল। ২০০৭ সাল পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া বলবৎ ছিল এবং বর্তমানেও তাদের লাইসেন্স নবায়নের সুযোগ রয়েছে। ফলশ্রুতিতে, ডেন্টাল ডিপ্লোমাধারীদেরও বিএমডিসি থেকে নিবন্ধন বা লাইসেন্স পাওয়ার পূর্ণ আইনগত অধিকার রয়েছে।
বর্তমান BMDC আইন, ২০১০-এর ১৪ ধারার বিধান:
১৪। ডেন্টাল চিকিৎসা-শিক্ষা যোগ্যতার স্বীকৃতি—
(১) বাংলাদেশে অবস্থিত বা বাংলাদেশের বাহিরে অবস্থিত কোনো ডেন্টাল চিকিৎসা-শিক্ষা যোগ্যতার ডিগ্রি বা ডিপ্লোমাধারী কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশে উক্ত ডিগ্রি বা ডিপ্লোমা ব্যবহার করিতে চাহিলে, তবে এই আইনের অধীন কাউন্সিল কর্তৃক স্বীকৃত হইতে হইবে।
(২) বাংলাদেশে অবস্থিত বা বাংলাদেশের বাহিরে অবস্থিত ডেন্টাল চিকিৎসা-শিক্ষা যোগ্যতার ডিগ্রি বা ডিপ্লোমাধারী কোনো ব্যক্তি বা ডেন্টাল প্রতিষ্ঠানের নাম চতুর্থ তফসিলে অন্তর্ভুক্ত না থাকিলে, উক্ত প্রতিষ্ঠানকে বা, ক্ষেত্রমত, উক্ত ডিগ্রি বা ডিপ্লোমাধারী ব্যক্তিকে এই আইনের অধীনে উক্ত যোগ্যতার স্বীকৃতি অর্জনের লক্ষ্যে কাউন্সিলের নিকট আবেদন করিতে হইবে।
ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা ও প্রস্তাবনা
১. আইনি বাধ্যবাধকতা ও রিট পিটিশন:
বিডিএস (BDS) চিকিৎসকরা যদি চান যে চার বছর মেয়াদী ডেন্টাল ডিপ্লোমাধারীরা কেবল তাদের অধীনে ডেন্টাল ল্যাবে কাজ করুক, তবে প্রতিটি ডেন্টাল সার্জারি পয়েন্ট ও ক্লিনিকে কমপক্ষে একজন করে ডেন্টাল ডিপ্লোমাধারী নিয়োগ দেওয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে। সেক্ষেত্রে মহামান্য সুপ্রিম কোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করে ডেন্টাল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ ছাড়া সকল ডেন্টাল ক্লিনিক সিলগালা করার আইনি সুযোগ তৈরি হতে পারে। (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে স্লোগান হতে পারে: "নো ডেন্টাল ল্যাব, নো ডেন্টাল চিকিৎসা")।
২. সীমিত পরিসরে নিবন্ধন ও প্র্যাকটিসের সুযোগ:
বিকল্প হিসেবে, বিএমডিসি নিবন্ধিত প্রায় ৫ হাজার "অনুমোদিত দন্ত চিকিৎসকদের" (যাদের প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি বা ডিপ্লোমা ছিল না) মতো ডেন্টাল ডিপ্লোমাধারীদেরও বিএমডিসি কর্তৃক নিবন্ধনের সুযোগ ও প্রাথমিক দন্ত চিকিৎসা করার সীমিত অনুমোদন দেওয়া যেতে পারে। এতে দেশের প্রান্তিক ও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর প্রাথমিক দন্ত চিকিৎসায় এক অভূতপূর্ব সুফল বয়ে আনবে।
অতএব, বিএমডিসি কর্তৃপক্ষের উচিত অবিলম্বে আইনের ১৪(১), (২) ও (৪) ধারার আলোকে ডেন্টাল চিকিৎসা-শিক্ষা যোগ্যতার ডিপ্লোমাধারীদের নিবন্ধনের ব্যবস্থা করা এবং চতুর্থ তফসিলে তাদের অন্তর্ভুক্ত করে দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান ঘটানো।